তাওয়াসসুলের ভাষাগত ও শরয়ী অর্থ | Sunnah Seekers

 তাওয়াসসুল (التوسل) — অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায় — ইসলামী আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি সঠিকভাবে বোঝা অত্যন্ত প্রয়োজন, কারণ সঠিক তাওয়াসসুল ঈমানের অংশ, আর ভ্রান্ত তাওয়াসসুল মানুষকে শিরক বা বিদআতে ফেলতে পারে। নিচে এর বিশদ ব্যাখ্যা ও বিভাগসমূহ উপস্থাপন করা হলো।


তাওয়াসসুলের ভাষাগত ও শরয়ী অর্থ

ভাষাগত অর্থ:
তাওয়াসসুল এসেছে “وسيلة” (ওয়াসিলাহ) শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো এমন কোনো মাধ্যম বা উপায়, যার মাধ্যমে কেউ কোনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বা ব্যক্তির নিকটবর্তী হতে পারে।

শরয়ী (ইসলামী) অর্থ:
আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এমন আমল বা উপায় অবলম্বন করা যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অনুমোদিত।


কুরআনের দলিলসমূহ

১️⃣ সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩৫)

"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্য অর্জনের উপায় (ওসীলা) অনুসন্ধান কর, এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফল হও।"

🔹 তাফসির: কাতাদাহ (রহ.) বলেন — ওসীলা অর্থাৎ এমন আমল করা যা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের উপায়।


২️⃣ সূরা আল-ইসরা (১৭:৫৭)

"যাদের তারা ডাকে (মিথ্যা উপাস্য মনে করে), তারা নিজেরাই তাদের প্রতিপালকের নিকট নৈকট্যের উপায় (ওসীলা) খোঁজে—তাদের মধ্যে কে সবচেয়ে নিকটবর্তী—তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।"

🔹 তাফসির: এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, এমনকি ফেরেশতা, নবী ও সৎ ব্যক্তিরাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় খোঁজেন। অতএব, ওসীলা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে বৈধ আমল হতে হবে।


তাওয়াসসুলের বিভাগসমূহ

তাওয়াসসুল মূলত দুই প্রকার —

১️⃣ বৈধ তাওয়াসসুল (شرعي التوسل)

২️⃣ অবৈধ বা নিষিদ্ধ তাওয়াসসুল (بدعي أو شركي التوسل)


১. বৈধ তাওয়াসসুল

বৈধ তাওয়াসসুল তিনভাবে হতে পারে:

ক. আল্লাহর নাম ও গুণের মাধ্যমে তাওয়াসসুল করা

যেমন বলা: “হে রহমতশীল আল্লাহ, তোমার রহমতের দ্বারা আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি।”

📖 দলিল:

“আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং সেই নামগুলোর মাধ্যমে তাঁকে ডাকো।” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৮০)


খ. নিজের সৎ আমলের মাধ্যমে তাওয়াসসুল করা

যেমন: “হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য নামাজ আদায় করেছি, রোযা রেখেছি, এ সৎ আমলের মাধ্যমে তোমার নিকট চাই যে তুমি আমার দো‘আ কবুল কর।”

📖 দলিল:

তিন ব্যক্তির গুহার হাদীস (বুখারী ও মুসলিম) — তারা প্রত্যেকে নিজেদের সৎ আমলের মাধ্যমে দো‘আ করেছিল, এবং আল্লাহ তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন।


গ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবিত অবস্থায় তাঁর দো‘আ চাওয়া

যেমন: সাহাবীরা নবীর জীবদ্দশায় তাঁর কাছে দো‘আ চেয়েছেন, যেন তিনি আল্লাহর কাছে দো‘আ করেন।

📖 দলিল:

উমর (রাঃ) যখন খরা দেখা দেয়, তখন তিনি বলেন: “হে আল্লাহ! আমরা নবীর মাধ্যমে তোমার নিকট বৃষ্টি চাইতাম, এখন আমরা নবীর চাচা আব্বাসের মাধ্যমে চাই।” (বুখারী)

🔹 এখানে নবীর জীবিত অবস্থায় তাঁর দো‘আ ছিল ওসীলা, কিন্তু মৃত্যুর পর কারও কাছে দো‘আ চাওয়া বৈধ নয়।


২. অবৈধ বা নিষিদ্ধ তাওয়াসসুল

এর কয়েকটি রূপ:

ক. মৃত ব্যক্তির মাধ্যমে তাওয়াসসুল করা

যেমন বলা: “হে নবী! আমাকে সাহায্য করুন” বা “হে পীর সাহেব, আমার দো‘আ কবুল করান।”
➡️ এটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে, কারণ মৃত কেউ দো‘আ শুনতে বা আল্লাহর কাছে সাহায্য করতে পারে না।

খ. অবৈধ উপায় বা ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে তাওয়াসসুল করা

যেমন: পদমর্যাদা, বংশ, বা অমুসলিমের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট যাওয়া — ইসলামে এর কোনো প্রমাণ নেই।


সারসংক্ষেপ

ধরন উদাহরণ শরয়ী অবস্থা
আল্লাহর নাম দ্বারা তাওয়াসসুল “ইয়া রহমান, ইয়া গফুর” বৈধ ✅
নিজের সৎ আমল দ্বারা নামাজ, সাদকা বৈধ ✅
জীবিত ধার্মিক ব্যক্তির দো‘আ চাওয়া “আমার জন্য দো‘আ করুন” বৈধ ✅
মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তির মাধ্যমে “হে নবী, সাহায্য করুন” অবৈধ/শিরক ❌

তাওয়াসসুলের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, কোনো মাধ্যম বা ব্যক্তিকে উপাস্য বানানো নয়।

আল্লাহ বলেন:
“দো‘আ করো আমাকে, আমি তোমাদের দো‘আ কবুল করব।” (সূরা গাফির ৪০:৬০)



Comments

Popular posts from this blog

ইফতার প্রস্তুতি: ইফতারের আগে কী করা উচিত?

লাইলাতুল কদর বেজোড় রাতে খোঁজার নির্দেশ