ভালো কথা, প্রতিবেশী ও অতিথির অধিকার | আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,

 ভালো কথা, প্রতিবেশী ও অতিথির অধিকার

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।”
— সহীহ বুখারী ও মুসলিম
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের মধ্যে উত্তম চরিত্র ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন:



১. ভালো কথা বলা বা নীরব থাকা
এটি একটি শর্তসাপেক্ষ আদেশ। ঈমানদার ব্যক্তি কেবল ভালো কিছু বলবে, অন্যথায় চুপ থাকবে।
ভালো কথা বলতে বোঝায়: আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, উপদেশ, সদ্ব্যবহার, সত্য বলা, উপকারী কথা।
নীরবতা তখনই ভালো, যখন কথা বলে কোনো উপকার নেই, বরং বিপদ হতে পারে।
যেমন বলা হয়:
“চুপ থাকা অলংকার ছাড়া অলংকার, দুর্গ ছাড়া দুর্গ।”
২. প্রতিবেশীকে সম্মান করা
প্রতিবেশী মানে শুধু পাশের বাড়ির লোক নয়, বরং আশপাশে বসবাসকারী, সহযাত্রী, এমনকি সহকর্মীও হতে পারে।
যত কাছের প্রতিবেশী, তার অধিকার তত বেশি।
প্রতিবেশী তিন ধরনের হয়:
মুসলিম এবং আত্মীয়: তিনটি অধিকার — ইসলাম, আত্মীয়তা ও প্রতিবেশিত্ব।
মুসলিম কিন্তু আত্মীয় নয়: দুটি অধিকার — ইসলাম ও প্রতিবেশিত্ব।
অমুসলিম প্রতিবেশী: একটিমাত্র অধিকার — প্রতিবেশিত্ব।
কীভাবে সম্মান করা যায়?
সদ্ব্যবহার, কষ্ট না দেওয়া, উপহার দেওয়া, আমন্ত্রণ জানানো, দেখা-সাক্ষাৎ ইত্যাদির মাধ্যমে।
৩. অতিথিকে সম্মান করা
মেহমানদারি ইসলামের একটি মহৎ গুণ।
নবীজী বলেছেন:
“অতিথিকে এক দিন ও এক রাত যথাযথ সম্মান দেওয়া ওয়াজিব, তিন দিন পর্যন্ত সম্মান করা সুন্নত, এরপর যা দেওয়া হয় তা সদকা।”
(বুখারী ও মুসলিম)
অতিথির অধিকার তিন স্তরের:
ওয়াজিব: একদিন একরাত।
সুন্নত: তিনদিন পর্যন্ত।
সদকা: তার বেশি হলে।
কাদের জন্য এই অধিকার?
মূলত দূর থেকে আগত ভ্রমণকারী অতিথির জন্য।
একই শহরের অতিথিকেও ভালোভাবে আপ্যায়ন করা উত্তম, যদিও সেটি ওয়াজিব নয়।
হাদিসটি থেকে যা শিখি
১. ঈমান কেবল অন্তরের ব্যাপার নয়, বরং আচরণ ও ব্যবহারেও তা প্রকাশ পায়।
২. মুখের কথা নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানদারের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ভালো না হলে চুপ থাকা উত্তম।
৩. প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার ইসলামের এক বড় নির্দেশনা, যা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি আনে।
৪. অতিথিকে সম্মান জানানো ইসলামি আদর্শের প্রতিফলন, যা ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি সৃষ্টি করে।
৫. নীরবতাও ইবাদতের অংশ, যদি তা পাপ থেকে রক্ষা করে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়।
উপসংহার
এই হাদিসটি আমাদের সামাজিক জীবন ও ব্যক্তিত্ব গঠনে দিকনির্দেশনা দেয়। একজন প্রকৃত মুসলমান শুধু ইবাদতগুজার নয়, বরং সে নিজের মুখ, মন এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে — যেন তার মাধ্যমে সমাজে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের বিস্তার হয়।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এই হাদিস অনুযায়ী জীবন গঠনের তাওফিক দেন।
আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

ইফতার প্রস্তুতি: ইফতারের আগে কী করা উচিত?

লাইলাতুল কদর বেজোড় রাতে খোঁজার নির্দেশ