সমবেদনা জানানোর শিষ্টাচার — ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে
সমবেদনা জানানোর শিষ্টাচার — ইসলাম কী বলে?
লিখেছেন: Sunnah Seeker Team
মানুষের জীবন সুখ-দুঃখের সমন্বয়ে গঠিত। কোনো মৃত্যু, বিপদ বা কষ্টের সময় একজন মুসলিম কীভাবে নিজে ধৈর্য ধারণ করবে এবং অপর মুসলিম ভাই/বোনকে সান্ত্বনা দিবে — ইসলাম তার একটি নিখুঁত রূপরেখা দিয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং অবশ্যই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।”
— [সূরা আল-বাকারা: ২:১৫৬]
বিপদের সময় ধৈর্যের পুরস্কার
উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কোন মুসলিম বিপদে পড়ে এই দোআ করে:
‘إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَاخْلُفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا’
(হে আল্লাহ! আমার বিপদের বিনিময়ে আমায় পুরস্কৃত করো এবং এর চেয়ে ভালো কিছু দান করো),
তাহলে আল্লাহ তাকে তার বিপদের পরিবর্তে আরও উত্তম কিছু দান করেন।”
— [সহীহ মুসলিম]
উম্মে সালামা নিজেও এ দোআ করেছিলেন এবং আল্লাহ তাকে স্বামী হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দান করেছিলেন।
সমবেদনা জানাতে এসে করণীয়
✅ শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া
শোকাহত ব্যক্তি ছোট বা বড় — সবাইকে সান্ত্বনা দেওয়া মুস্তাহাব। তবে এমন কারো প্রতি সমবেদনা জানাতে হবে না, যে এখনো বুঝতে পারে না (যেমন ছোট শিশু)।
✅ সুন্নাহ অনুযায়ী কথা বলা
সবচেয়ে উত্তম সমবেদনার বাক্য হলো নবী ﷺ এর শিখানো:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর যা নেওয়া হয়েছে তা তাঁরই মাল, এবং যা তিনি দিয়েছেন, তাও তাঁরই মাল। সবকিছুর একটি নির্ধারিত সময় আছে। সুতরাং ধৈর্য ধরো এবং সাওয়াবের আশা করো।"
✅ মৃত ব্যক্তির জন্য দোআ করা
“হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করো, মর্যাদা বৃদ্ধি করো, কবরকে প্রশস্ত করো, ও তার পরিবারকে উত্তম প্রতিদান দান করো।”
— [সহীহ মুসলিম]
✅ শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো
রাসূল ﷺ বলেন:
“জাফরের পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করো, কারণ তাদের এমন একটি বিষয় ব্যস্ত রেখেছে যা তাদের রান্না করতে দিচ্ছে না।”
— [আহমাদ, ইবনে মাজাহ]
✅ অনুপযুক্ত কাজ থেকে বিরত থাকা
-
গায়ে হাত মারা, চিৎকার-চেঁচামেচি করা
-
বিদআতি কার্যক্রম যেমন:
-
এক হাজার বার সূরা ইখলাস পড়া
-
একত্র হয়ে ত্রিশটি পারা পড়া
-
চল্লিশ দিনে মিলাদ/গিয়ারহি
-
শোকসভায় কুরআন তিলাওয়াত বা খাবারের আয়োজন
এসব বিদআত ইসলামের পরিপন্থী।
-
সমবেদনার সময় নিন্দনীয় কথা ও কাজ
বলা যাবে না:
-
"আল-বাকিয়াহ ফি হায়াতিকা"
-
"তার যা কাটা গেল, তোমার জীবনে যোগ হোক"
-
বারবার এককথা বলা বা বাহ্যিক আচারকে বড় করা
মৃত অমুসলিমদের জন্য দোআ
কুরআনে বলা হয়েছে:
“নবী ও মুমিনদের জন্য জায়েয নয় যে তারা মুশরিকদের জন্য দোআ করবে, এমনকি তারা আত্মীয়স্বজন হলেও।”
— [সূরা তাওবা: ৯:১১৩]
অমুসলিমদের প্রতি সমবেদনা জানানো
-
অসুস্থ হলে দেখা করা, বিপদের সময় সান্ত্বনা দেওয়া — জায়েয
-
তবে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইসলামের দাওয়াহ দেওয়া
-
মৃতের জন্য দোআ নয়, বরং জীবিতের জন্য কল্যাণ কামনা করা যায়
বাস্তব জীবনে হাদিসের প্রয়োগ
নবী ﷺ বলেন:
“তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে দোআ করো না; বরং কল্যাণের জন্য দোআ করো, কারণ ফেরেশতারা তাতে আমীন বলে।”
🟢 বাস্তব প্রয়োগ:
-
শোকের মুহূর্তে মুখ ফসকে কিছু বলার আগে চিন্তা করা
-
নিজের ও পরিবারের জন্য খারাপ কথা না বলা
-
হতাশা বা রাগের সময় দোআতে ভালো চাওয়া
সংক্ষিপ্তভাবে — সমবেদনা জানানোর কার্যক্রম
| বিষয় | ইসলামic রায় |
|---|---|
| ✅ মুসলিমকে সমবেদনা | সুন্নাহ, ফজিলতপূর্ণ |
| ✅ অমুসলিমকে বিপদের সময় সান্ত্বনা | জায়েয (ইসলামের দাওয়াহের উদ্দেশ্যে) |
| ❌ মৃত অমুসলিমদের জন্য দোআ | নিষিদ্ধ |
| ❌ বিদআতি সমাবেশ/খাবার | গর্হিত |
সমবেদনা শুধুমাত্র দুঃখ প্রকাশ নয়, এটি একজন মুসলিম ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানো, তার ঈমান শক্তিশালী করার মাধ্যম।
ধৈর্য, সঠিক দোআ, এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আচরণ — এগুলোই একজন মুসলিমের শোক প্রকাশের সেরা রীতি।
আল্লাহ আমাদেরকে বিপদে ধৈর্য ধরার তাওফিক দিন,
আর শোকাহত ভাই/বোনের পাশে সঠিকভাবে দাঁড়ানোর হিম্মত দিন। আমিন।
– Sunnah Seeker Team
ইসলামিক আদব ও সহীহ জ্ঞান ভিত্তিক আরও লেখা পেতে আমাদের সাথে থাকুন।

Comments
Post a Comment