হজ্জের অপরিহার্য অংশ ও ইহরাম অবস্থার বিধিনিষেধ: একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড

 হজ্জের অপরিহার্য অংশ ও ইহরাম অবস্থার বিধিনিষেধ: একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড

হজ্জ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। এটি একটি মহান ইবাদত যা মুসলমানের জীবনে একবার আদায় করা ফরজ, যদি সে তা সামর্থ্য রাখে। হজ্জ শুধু শরীরচর্চার একটি রূপ নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের এক অনন্য শিক্ষা। এই পথ চলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যেগুলো জানা ও মানা আবশ্যক। 


এই লেখায় আমরা হজ্জের অপরিহার্য চারটি অংশ, ইহরাম অবস্থায় করণীয় ও বর্জনীয়, এবং ইহরাম ভঙ্গের ফলে ফিদিয়ার বিধান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

হজ্জের চারটি অপরিহার্য অংশ

১. ইহরাম বাঁধা
হজ্জ বা ওমরাহর ইবাদতের জন্য নিয়ত করে ইহরামে প্রবেশ করাকে ইহরাম বাঁধা বলা হয়। এটি হজ্জ শুরুর প্রথম পদক্ষেপ এবং এর আগে হজ্জের কোনো কাজ গ্রহণযোগ্য নয়।

২. আরাফায় অবস্থান
৯ জিলহজ্জ, দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের প্রধানতম অংশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হজ্জ হল আরাফা।” (তিরমিযি)

৩. তাওয়াফে ইফাদা
কুরবানির পর কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করা। এটি হজ্জ তাওয়াফ, যা হজ্জের অন্যতম রুকন।

৪. সাঈ করা
সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার চলাফেরা করা। এটি হজ্জ ও ওমরাহ উভয়ের অংশ।

এই চারটি কাজের যেকোনো একটি বাদ পড়লে হজ্জ শুদ্ধ হবে না।

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ

ইহরামে প্রবেশ করার অর্থ হলো নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলা। এই অবস্থায় কিছু কাজ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নিচে সেগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া হলো।

১. পুরুষদের সেলাই করা পোশাক পরিধান
যেমন জামা, প্যান্ট, মোজা বা পাগড়ি। ইহরাম এমন পোশাক হওয়া উচিত যা শরীরের সঙ্গে মিলে না যায় বা সেলাই করা না থাকে।

২. মহিলাদের নেকাব বা গ্লাভস পরা
মুখ ও হাত খোলা রাখতে হবে। তবে আব্রু রক্ষার জন্য মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, যেমন সাহাবিয়া আয়েশা (রা.) করতেন।

৩. মাথা ঢেকে রাখা (পুরুষদের জন্য)
পাগড়ি বা কোনো কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ, তবে ছায়ার নিচে থাকা বা ছাতা ব্যবহার করা বৈধ।

৪. সুগন্ধি ব্যবহার
ইহরাম বাঁধার পর কোনো ধরনের সুগন্ধি বা সুগন্ধিযুক্ত কাপড় ব্যবহার নিষিদ্ধ।

৫. চুল বা নখ কাটা
শরীরের কোনো অংশের চুল বা নখ কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৬. সহবাস বা যৌন ঘনিষ্ঠতা
আরাফার আগ পর্যন্ত সহবাস করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কাফফারা আদায় করতে হয় এবং পরের বছর পুনরায় হজ্জ করা ফরজ হয়।

৭. যৌন উত্তেজনামূলক কাজ
চুম্বন, কামনার দৃষ্টিতে তাকানো, স্পর্শ ইত্যাদি। এতে হজ্জ বাতিল না হলেও গুনাহ হয়।

৮. শিকার করা
স্থলজ শিকার করা হারাম, তবে হিংস্র বা ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা করা জায়েজ।

৯. বিবাহ বা বিবাহের প্রস্তাব
ইহরাম অবস্থায় বিয়ে বা বিয়ের চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাতিলযোগ্য।

ইহরাম ভঙ্গের কারণে ফিদিয়া (ক্ষতিপূরণ)

ইহরাম অবস্থায় কেউ যদি নিষিদ্ধ কাজ করে, তাহলে তার শাস্তির ধরন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এই ফিদিয়া চার ভাগে বিভক্ত।

১. যার জন্য কোনো ফিদিয়া নেই
যেমন কেউ ভুল করে বিয়ের চুক্তি করলে সেটি বাতিল হবে, তবে কাফফারা দিতে হবে না।

২. কঠোর ফিদিয়া প্রযোজ্য
আরাফার আগে সহবাস করলে হজ্জ বাতিল হয়। তাকে একটি উট কুরবানী করতে হবে, সেই বছর হজ্জ শেষ করে পরের বছর হজ্জ কাযা করতে হবে।

৩. বিকল্প সহ ফিদিয়া
যদি কেউ শিকার করে, তাহলে পশুর মূল্যের সমান খাদ্য দান, রোজা রাখা অথবা কুরবানী করতে হবে।

৪. রোগ বা প্রয়োজনে করা কাজের জন্য ফিদিয়া
যেমন কেউ মাথা মুণ্ডন করলে তিনটি বিকল্প:
‌‌- তিন দিন রোজা
‌‌- ছয়জন মিসকীনকে খাবার
‌‌- একটি ভেড়া কুরবানী

ভুলবশত, অজ্ঞতাবশত বা প্রয়োজনে নিষিদ্ধ কাজ করলে করণীয়

যদি কেউ অজান্তে, ভুল করে বা চরম প্রয়োজনে নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলে, যেমন ঠান্ডা থেকে বাঁচতে জামা পরে, বা রোগের কারণে মাথা মুণ্ডন করে, তাহলে তার উপর কোনো গুনাহ নেই, তবে ফিদিয়া দিতে হবে।

ইহরাম অবস্থায় যা জায়েজ

  • খোলা জুতা (যাতে গোড়ালি দেখা যায়)

  • চশমা, হাতঘড়ি, আংটি, হিয়ারিং এইড

  • কাপড় ধোয়া বা পরিবর্তন

  • গোসল ও শরীর ধোয়া

  • কোমরে বেল্ট বা ব্যাগ ব্যবহার

  • মাথায় ছাতা রাখা বা ছায়ায় থাকা

শেষ কথা

হজ্জ একটি শুদ্ধতার যাত্রা। এই যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের উচিত নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ও আমল করা। ইহরামের বিধিনিষেধের প্রতি যত্নবান হওয়া শুধু আমাদের হজ্জকে শুদ্ধ করে না, বরং আমাদের আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মনোভাবকেও পরিপূর্ণ করে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শুদ্ধ হজ্জ করার তাওফিক দিন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

ইফতার প্রস্তুতি: ইফতারের আগে কী করা উচিত?

লাইলাতুল কদর বেজোড় রাতে খোঁজার নির্দেশ