Posts

ইচ্ছা, প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি: মুসলিম জীবনের মূল শিক্ষা

Image
  ইচ্ছা, প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি: মুসলিম জীবনের মূল শিক্ষা মানুষের জীবনে ইচ্ছা এবং প্রবৃত্তি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক, অন্যদিকে এগুলো অনেক সময় পাপ এবং আত্মীয় ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামী শিক্ষায় এই ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। নবী ﷺ এবং সাহাবাদের বাণী থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। ১. ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি পাপকে তুচ্ছ মনে করায় যে ব্যক্তি শুধু নিজের খেয়াল-খুশি অনুসরণ করে, সে ধীরে ধীরে পাপকে ছোট মনে করতে শুরু করে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন: “মুমিন ব্যক্তি তার পাপকে পাহাড়ের নীচে বসা মনে করে, কিন্তু পাপী ব্যক্তি পাপকে নাকের সামনে দিয়ে যাওয়া মাছির মতো মনে করে।” ২. ইচ্ছা ও বাসনার প্রতি দাসত্ব ইবনুল মুবারক বলেছেন যে নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার দাস হওয়া মানে আত্মাকে দুর্বল করা। যারা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে চায়, তারা ইচ্ছা ও বাসনার বিরুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করে। ৩. ধৈর্য ও আধ্যাত্মিক প্রতিদান আল্লাহ তাআলা বলেন: “কিন্তু যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং তার আত্মাকে অবৈধ প্রবৃত্তি থেকে ...

কিয়ামতের কম্পন ও আমলের হিসাব: সূরা আয-যালযালাহর শিক্ষা

কিয়ামতের কম্পন ও আমলের হিসাব: সূরা আয-যালযালাহর শিক্ষা পবিত্র Qur'an -এর ৯৯ নম্বর সূরা, Surah Az-Zalzalah , একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী মক্কী সূরা। মাত্র আটটি আয়াতের এই সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য, পৃথিবীর সাক্ষ্যদান এবং মানুষের আমলের সূক্ষ্ম হিসাবের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। কিয়ামতের ভয়াবহ কম্পন সূরার শুরুতেই আল্লাহ বলেন, যখন পৃথিবী তার চূড়ান্ত ভূমিকম্পে প্রকম্পিত হবে এবং তার ভেতরের বোঝা বের করে দেবে। এই কম্পন সাধারণ ভূমিকম্প নয়; এটি হবে কিয়ামতের সূচনালগ্নের এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অন্যত্র আল্লাহ বলেন: “হে মানবজাতি, তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।” — Surah Al-Hajj (২২:১) পৃথিবী তার “বোঝা” বের করে দেবে—অর্থাৎ মৃত মানুষদের এবং ভেতরে সঞ্চিত সবকিছু উগরে দেবে। মানুষ হতবাক হয়ে বলবে, “এর কী হলো?” এটি হবে বিস্ময় ও আতঙ্কের প্রশ্ন। পৃথিবীর সাক্ষ্যদান সেদিন পৃথিবী তার সংবাদ বর্ণনা করবে, কারণ তার প্রভু তাকে আদেশ করবেন। হাদিসে এসেছে, Abu Huraira (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: পৃথি...

অন্যায় কাজ দেখা এবং তা প্রতিহত করার তত্ত্ব

Image
 অন্যায় কাজ দেখা এবং তা প্রতিহত করার তত্ত্ব পবিত্র হাদিসে Abu Sa'id Al-Khudri (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে কোনো অন্যায় কাজ দেখে, সে যেন তা হাতে প্রতিহত করে; যদি তা না পারে, তবে জিহ্বা দিয়ে (কথা বলে); আর যদি তা না পারে, তবে হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করে। এবং হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করা হল ঈমানের দুর্বলতম স্তর।”   হাদিসের স্তরসমূহ ১. হাতে প্রতিহত করা সরাসরি পদক্ষেপের মাধ্যমে অন্যায় কাজ বন্ধ করা। উদাহরণ: কেউ অন্যায় করছে দেখলে তাকে থামানো বা সংশোধনের ব্যবস্থা করা। ২. জিহ্বা দিয়ে প্রতিহত করা মৌখিক নিন্দা, সঠিক পরামর্শ বা সতর্কতা দেওয়া। প্রজ্ঞা এবং সৌজন্য বজায় রাখা অপরিহার্য। ৩. হৃদয় দিয়ে প্রতিহত করা অন্তরে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা করা। এটি সর্বনিম্ন স্তরের প্রতিহতকরণ, তবে যারা হাতে বা জিহ্বা দিয়ে তা করতে পারে না তাদের জন্য এটি বৈধ। হাদিসের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ ভুল কাজের সনাক্তকরণ: শুধুমাত্র এমন কর্মকে অন্যায় বলা যায়, যা আলেমদের ঐক্যমত অনুযায়ী স্পষ্টভাবে ভুল। মতবিরোধ থাকলে ব্যক্তিগত বিচার করা যাবে না। নিয়মিত সতর্কতা: যে ব্যক্তি অন্যায় প্রতিহত করতে চায়, তার উদ্দেশ্...

ঈমান ও কুফরের পরিণতি: সূরা আল-বাইয়্যিনাহর আলোকে মানবতার প্রকৃত মানদণ্ড

Image
  ঈমান ও কুফরের পরিণতি: সূরা আল-বাইয়্যিনাহর আলোকে মানবতার প্রকৃত মানদণ্ড মানবজাতির মর্যাদা কীসে নির্ধারিত হয়? সম্পদ, বংশ, জ্ঞান, নাকি ক্ষমতায়? ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তার ঈমান ও আমলের উপর। এই মৌলিক সত্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে Qur'an -এর সূরা Surah Al-Bayyinah -এ (৯৮:৬–৮)। এই আয়াতগুলো মানবজাতিকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করে—একদল “নিকৃষ্টতম সৃষ্টি”, আরেকদল “সর্বোত্তম সৃষ্টি”। কুফরের পরিণতি: নিকৃষ্টতার কারণ আয়াতে বলা হয়েছে, আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কুফর করেছে তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে এবং তারাই “শরুল বারিয়্যাহ”—সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের নিকৃষ্ট বলা হয়েছে কেবল অবিশ্বাসের কারণে নয়, বরং হিদায়াত পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করার কারণে। আহলে কিতাবদের কাছে আসমানি কিতাব ছিল, যাতে হেদায়েত ও আলো ছিল। মুশরিকদের পূর্বপুরুষরা তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা তা অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের অপরাধ সাধারণ অজ্ঞতার চেয়ে অনেক গুরুতর। এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়—সত্য জানার পর তা অস্বীকার ...

ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশির প্রভাব: হৃদয়ের রোগ থেকে মুক্তির পথ

Image
  ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশির প্রভাব: হৃদয়ের রোগ থেকে মুক্তির পথ মানুষের হৃদয় হলো তার চরিত্র, ইবাদত ও আচরণের মূল কেন্দ্র। কিন্তু অনেক সময় আমরা আমাদের নফস, ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশির জালে আটকে পড়ি, যা আমাদের ইসলামী জীবন, ইমান এবং আখেরাতের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই ব্লগে আমরা জানব—কেন খেয়াল-খুশি এবং আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ ক্ষতিকর, এর কারণগুলো কি এবং আমরা কিভাবে নিজের হৃদয়কে সুস্থ রাখতে পারি। ইচ্ছা ও খেয়াল-খুশির সংজ্ঞা ভাষাগত অর্থে, “হাওয়া” হলো কোনো জিনিস পছন্দ করা বা আকাঙ্ক্ষা করা। ইসলামী পরিভাষায়, হাওয়া মানে হলো—ইসলামের নির্দেশাবলীর প্রতি অমনোযোগী হয়ে শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছার আনন্দ খোঁজা। শরীয়াহ আমাদের সতর্ক করেছে, যে কোনো কাজের মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত আল্লাহর নসিহত, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে, না কি শুধুমাত্র নফসের ইচ্ছার দ্বারা। ইচ্ছা অনুসরণের কারণগুলো মানুষ কেন নিজের খেয়াল-খুশি অনুসরণ করে? মূল কারণগুলো হলো: শিশুকাল থেকে নিয়ন্ত্রণহীন: ছোটবেলায় যখন কেউ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করে এবং সীমাবদ্ধতা শেখানো হয় না, তখন সে বড় হয়ে ইচ্ছার দাস হয়ে যায়। প্রতিকূল সঙ্গ: যারা...

“তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় তারাই, যারা তোমাদের মধ্যে আচরণের দিক থেকে সবচেয়ে উত্তম।

  “তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় তারাই, যারা তোমাদের মধ্যে আচরণের দিক থেকে সবচেয়ে উত্তম।” এর মূল শিক্ষা কী? 🔹 নবী ﷺ–এর নিকট প্রিয় হওয়ার মানদণ্ড এখানে রাসূল ﷺ স্পষ্ট করে দিয়েছেন— তাঁর কাছে প্রিয় হওয়ার মাপকাঠি হলো: সুন্দর আচরণ শালীন ভাষা ধৈর্য, সহনশীলতা ও নম্রতা ইবাদতের সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সাথে ব্যবহার । 🔹 আচরণ ঈমানের প্রতিফলন উত্তম আখলাক প্রমাণ করে— হৃদয় পরিশুদ্ধ ঈমান জীবন্ত সুন্নাহ বাস্তব জীবনে কার্যকর এ কারণেই নবী ﷺ বলেছেন: “মুমিনদের মধ্যে পূর্ণ ঈমানদার তারাই, যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” 🔹 সুন্দর আচরণ—সবাইকে নিয়ে এই হাদিস শুধু পরিবার বা বন্ধুদের জন্য নয়— শত্রু ভিন্নমতাবলম্বী দুর্বল ও সাধারণ মানুষ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। উপসংহার যে ব্যক্তি নবী ﷺ–এর ভালোবাসা চায়, সে যেন প্রথমে নিজের আচরণ সুন্দর করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম আখলাকের মাধ্যমে নবী ﷺ–এর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।

তাকফিরের বিদ‘আত—উম্মাহর জন্য এক ভয়াবহ বিপদ

Image
  তাকফিরের বিদ‘আত—উম্মাহর জন্য এক ভয়াবহ বিপদ ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও বিদ‘আত রয়েছে, যা শুধু ব্যক্তি নয়— পুরো উম্মাহকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে । এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক, সবচেয়ে ক্ষতিকারক এবং আল্লাহর ক্রোধ ও কঠিন শাস্তির দিকে সবচেয়ে দ্রুত নিয়ে যায় এমন একটি বিদ‘আত হলো— অন্য মুসলমানকে কাফের (তাকফির) মনে করা । এই ভ্রান্ত আক্বীদার সূচনা করেছিল খারেজিরা , যারা সালিশের ঘটনার পর খলিফা আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাকফির কী? তাকফির বলতে বোঝায়— 👉 কাউকে নিশ্চিতভাবে মুসলিম প্রমাণিত হওয়ার পরও 👉 তাকে কাফের বা অবিশ্বাসী বলে গণ্য করা । এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়; বরং এটি একটি শরয়ী সীমালঙ্ঘন , যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তাকফিরের ভয়াবহ পরিণতি রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকফিরের ব্যাপারে উম্মাহকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলে: ‘হে কাফের’, তাদের একজনের উপর তা ফিরে যায়।” — সহীহ বুখারী ও মুসলিম আরও বলেছেন: “কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে কুফরের অভিযোগ করলে, সে যদি প্রকৃতপক্ষে কাফের না হয়, তবে অভিযোগটি তা...