ইসলামী পরিভাষায়, হজ্জ হলো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানসমূহে (কাবা, আরাফা, মুযদালিফা, মিনা) নির্দিষ্ট বিধানসমূহ অনুযায়ী ইহরাম বেঁধে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত ইবাদত সম্পাদন করা।
হজ্জের সংজ্ঞা
ইসলামী পরিভাষায়, হজ্জ হলো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানসমূহে (কাবা, আরাফা, মুযদালিফা, মিনা) নির্দিষ্ট বিধানসমূহ অনুযায়ী ইহরাম বেঁধে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত ইবাদত সম্পাদন করা।
হজ্জের ফরজ (Obligatory Acts of Hajj)
হজ্জে তিনটি মূল ফরজ আছে। এগুলোর যেকোনো একটি বাদ পড়লে হজ্জ সম্পূর্ণ হয় না এবং ক্ষতিপূরণস্বরূপ একটি কুরবানি দিতে হয়।
১. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা
-
নির্দিষ্ট সীমারেখা বা স্থানকে মিকাত বলা হয়।
-
হজ্জ বা উমরাহ করতে হলে সেই মিকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম বাঁধা ফরজ।
-
কেউ যদি ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করে, তাহলে তাকে মিকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে।
-
যদি না ফিরে আসে, তবে তাকে একটি কুরবানি (ফিদইয়া) দিতে হবে।
২. আরাফায় অবস্থান (Wuquf at Arafah)
-
এটি হজ্জের প্রধান স্তম্ভ।
-
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“আল-হাজ্জু আরাফাহ” অর্থাৎ “হজ্জ মানেই আরাফা।” -
আরাফার ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা ফরজ।
-
কেউ যদি দিনে বা রাতে অল্প সময়ের জন্যও সেখানে অবস্থান করে, তার হজ্জ সম্পন্ন হয়।
৩. তাওয়াফে ইফাদা (Main Tawaf after Arafah)
-
কাবা শরিফের চারপাশে সাত চক্কর দেয়া।
-
এটি হজ্জের মূল তাওয়াফ, যা আরাফার পর করা হয়।
-
প্রত্যেক চক্করে কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) থেকে শুরু হয় এবং সেখানেই শেষ হয়।
-
প্রত্যেক চক্কর ডান দিক থেকে ঘুরতে হয়, অর্থাৎ কাবা শরিফ বাম পাশে রাখতে হয়।
হজ্জের ওয়াজিব (Necessary Acts of Hajj)
ওয়াজিব কাজগুলো ফরজের তুলনায় একটু নিচে। এগুলোর কোনটি বাদ দিলে হজ্জ হয়, তবে ফিদইয়া (কুরবানি) দিতে হয়।
১. মুযদালিফায় অবস্থান করা
-
আরাফা থেকে ফজরের আগে মুযদালিফায় পৌঁছে রাত কাটানো ওয়াজিব।
-
সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে পড়া হয়।
-
দুর্বল, নারী ও বয়স্করা ফজরের আগে মিনায় যেতে পারেন।
২. মিনায় রাত যাপন (তাশরীকের রাতগুলোতে)
-
যুলহিজ্জার ১১, ১২ ও ১৩ তারিখের রাত মিনায় কাটানো ওয়াজিব।
-
যারা পশু চরানোর দায়িত্বে বা অসুস্থ, তারা মওকুফ।
৩. জামারাতে পাথর নিক্ষেপ (Ramy al-Jamarat)
-
মিনায় তিনটি জামরাত রয়েছে: ছোট, মাঝারি ও বড় জামরাত।
-
প্রতিটিতে সাতটি ছোট পাথর নিক্ষেপ করতে হয়, প্রতিবার “আল্লাহু আকবার” বলে।
-
পাথর ছোলার দানার চেয়ে বড় ও হ্যাজেলনাটের চেয়ে ছোট হওয়া উচিত।
-
সাতটি পাথর একসঙ্গে ছোঁড়া জায়েয নয়, আলাদা আলাদা ছুড়তে হয়।
-
পাথরগুলো গর্তে পড়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা
-
পুরুষদের জন্য পুরো মাথা মুন্ডন করা উত্তম; নারীরা চুলের ডগা সমান পরিমাণে কাটবে।
-
শুধু মাথার কিছু অংশ কাটা যথেষ্ট নয়।
৫. তাওয়াফে ওয়াদা (বিদায়ী তাওয়াফ)
-
হজ্জের সব কাজ শেষে, মক্কা ত্যাগের আগে কাবার চারপাশে শেষ তাওয়াফ করা ওয়াজিব।
-
এটি মক্কা থেকে বিদায়ের তাওয়াফ।
-
ঋতুমতী বা প্রসব-পরবর্তী রক্তপাতগ্রস্ত নারীদের জন্য এটি মওকুফ।
হজ্জের সুন্নত ও মুস্তাহাব কাজসমূহ
১. তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা ইশারা করা।
২. পুরুষদের জন্য প্রথম তিন চক্করে হালকা দৌড়ে তাওয়াফ করা।
৩. তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাআত নামাজ পড়া।
৪. জমজমের পানি পান করা এবং মুখমণ্ডলে লাগানো।
৫. সাঈ করা — সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাতবার যাতায়াত করা।
৬. তাওয়াফ ও সাঈর সময় দোয়া, তাসবিহ ও কুরআন তেলাওয়াত করা।
হজ্জের মূল ধাপসমূহ (Step by Step)
১. ইহরাম বাঁধা
-
মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা ও হজ্জের নিয়ত করা।
-
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা হজ্জান” বলা এবং তালবিয়া পাঠ শুরু করা।
২. মক্কায় প্রবেশ ও তাওয়াফ
-
কাবা শরিফে প্রবেশ করে তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করা (তামাত্তু করলে ইহরাম খোলা হয়)।
৩. ৮ জিলহজ্জে মিনায় যাত্রা
-
মিনায় গিয়ে নামাজ পড়া ও রাত যাপন।
৪. ৯ জিলহজ্জে আরাফায় অবস্থান
-
দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান।
-
দোয়া, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ ইত্যাদি করা।
৫. সূর্যাস্তের পর মুযদালিফায় যাত্রা
-
মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে পড়া এবং রাত কাটানো।
৬. ১০ জিলহজ্জে মিনায় ফিরে কাজগুলো সম্পন্ন করা
-
জামরাতে পাথর নিক্ষেপ (বড় জামরাত)।
-
কুরবানি করা।
-
মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা।
-
ইহরাম খোলা।
-
এরপর মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাদা করা।
৭. তাশরীকের দিনগুলোতে মিনায় থাকা
-
১১, ১২, ১৩ জিলহজ্জে মিনায় অবস্থান করে প্রতিদিন তিনটি জামরাতে পাথর নিক্ষেপ।
৮. বিদায়ী তাওয়াফ
-
সব কাজ শেষে মক্কা থেকে বের হওয়ার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা।
যদি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব কাজ বাদ পড়ে যায়
-
ফরজ কাজ বাদ গেলে: হজ্জ শুদ্ধ হয় না।
-
ওয়াজিব কাজ বাদ গেলে: হজ্জ হয়, কিন্তু একটি ফিদইয়া (কুরবানি) দিতে হয়।
-
সেই কুরবানির মাংস নিজে খাওয়া বা উপহার দেওয়া যায় না, সম্পূর্ণভাবে দান করতে হয়।
হজ্জের উদ্দেশ্য ও শিক্ষা
-
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
-
তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি লাভ।
-
মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
-
অহংকার, সম্পদ ও সামাজিক পার্থক্য দূর করা।
-
আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা।

Comments
Post a Comment