কথা বলার শিষ্টাচার: ইসলামী আদর্শে ভাষা ব্যবহারের নৈতিকতা
- Get link
- X
- Other Apps
কথা বলার শিষ্টাচার: ইসলামী আদর্শে ভাষা ব্যবহারের নৈতিকতা
লেখক: Sunnah Seekers Team
বিষয়: আদব ও আখলাক
ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে ভাষার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পর্ক তৈরির এক অপূর্ব ব্যবস্থা করেছেন।
যেমন কবি বলেন:
একজন মানুষের অর্ধেক হলো তার জিহ্বা আর বাকি অর্ধেক হলো তার হৃদয়।
ইসলামে জিহ্বার সংযম, ভদ্রতা, এবং সচেতনতা এক অনন্য গুণ হিসেবে বিবেচিত। আসুন জেনে নিই, কীভাবে একজন মুসলিমকে কথাবার্তায় শিষ্টাচার বজায় রাখতে হয়।
১. মসজিদে উচ্চস্বরে কথা না বলা
আল্লাহ বলেন:
তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো, নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।
(সূরা লুকমান ৩১:১৯)
ইবনে কাছীর ব্যাখ্যা করেন: প্রয়োজন ছাড়া কণ্ঠস্বর উঁচু করা উচিত নয়।
২. অহংকারপূর্ণ ও প্রভাবিতভাবে কথা বলা নিষিদ্ধ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত সেই ব্যক্তি যে প্রভাবিতভাবে অহংকার করে কথা বলে ও অন্যকে হেয় করে।
(তিরমিযী)
৩. মিথ্যা, গীবত, এবং অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
মানুষ এমন কিছু বলে বসে, যার পরিণতি না বুঝেই — ফলে সে জাহান্নামের গভীরে পতিত হয়।
৪. উপকার না থাকলে চুপ থাকা উত্তম
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
যে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে বা চুপ থাকে।
(বুখারী ও মুসলিম)
৫. স্পষ্ট ও বোঝার উপযোগী ভাষায় কথা বলা
আয়েশা (রাঃ) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত পরিষ্কার করে কথা বলতেন যে গুণে নেওয়া যেত।
আনাস (রাঃ) বলেন: তিনি প্রয়োজনে একটি কথা তিনবার বলতেন যাতে সবাই বুঝতে পারে।
৬. ভালো শব্দ চয়ন করা
আল্লাহ বলেন:
আমার বান্দারা যেন উত্তম কথা বলে, শয়তান যেন তাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে।
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৩)
৭. অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার না করা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অশ্লীলতা ও আক্রমণাত্মক কথাবার্তা থেকে মুক্ত।
কোন ব্যক্তির ঈমান পূর্ণাঙ্গ হবে না যদি তার হৃদয় ও জিহ্বা সুস্থ না থাকে।
(আহমাদ)
৮. শ্রোতার বোঝাপড়া অনুযায়ী কথা বলা
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন:
তুমি এমন কথা বলো না যা শ্রোতার জ্ঞান বা উপলব্ধির বাইরে — তা ফিতনার কারণ হতে পারে।
(মুসলিম)
৯. যার সাথে কথা বলছো, তার মর্যাদা অনুযায়ী সম্বোধন
যেমন, মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর খাদেমকে বলেছিলেন, “আমাদের খাবার আনো।”
কিন্তু যখন আল-খিদর আলাইহিস সালামকে শিক্ষা গ্রহণের অনুমতি চাইলেন, তখন বলেছিলেন, “আমি কি আপনার সাথে যেতে পারি...?”
(সূরা কাহফ ১৮:৬২–৬৬)
১০. যেখানে কথা বলা উচিত নয়, সেখানে নীরবতা
আল্লাহ বলেন:
তোমরা তাদের থেকে দূরে থাকো যারা আমার আয়াত নিয়ে উপহাস করে।
(সূরা আল-আন’আম ৬:৬৮)
১১. এমন বিষয়ে কথা না বলা যার সম্পর্কে জ্ঞান নেই
আল্লাহ বলেন:
যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না — কান, চোখ, হৃদয় সব জিজ্ঞাসিত হবে।
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬)
১২. মিথ্যা, বিদ্রূপ ও ঠাট্টা থেকে বিরত থাকা
আল্লাহ বলেন:
কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে, হয়তো তারা উত্তম হতে পারে।
(সূরা হুজুরাত ৪৯:১১)
১৩. বয়োজ্যেষ্ঠদের আগে কথা বলার সম্মান
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
যে বড়, সে আগে কথা বলুক।
১৪. কেউ কথা শেষ না করা পর্যন্ত থামিয়ে না দেওয়া
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উতবাহ ইবনে রাবিয়াহকে কথা শেষ করতে দিয়েছিলেন, এরপর নিজের বক্তব্য রেখেছিলেন।
১৫. বিশিষ্ট ব্যক্তির সামনে কথা বলার আগে অনুমতি চাওয়া
হাদীসে আছে, এক সাহাবি বললেন:
আমাকে অনুমতি দিন আমি বলি।
রাসূল বললেন: বলো।
(বুখারী ও মুসলিম)
১৬. তৃতীয় ব্যক্তি থাকলে দুইজন গোপনে কথা না বলা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
তোমরা তিনজন হলে, দুজন যেন গোপনে কথা না বলে অন্যজনকে বাদ দিয়ে।
(বুখারী ও মুসলিম)
১৭. গোপন কথা গোপন রাখা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
যদি কেউ অন্যকে গোপনে কিছু বলে এবং ঘুরে দাঁড়ায়, তবে সেটা আমানত – তা গোপন রাখা আবশ্যক।
উপসংহার
একজন মুসলিমের জিহ্বা শুধু মুখের অঙ্গ নয়, বরং তার ইমান, চরিত্র ও আদবের প্রতিচ্ছবি।
প্রতিটি কথা যেন হয় সদ্উদ্দেশ্যমূলক, নম্র, সত্য ও কল্যাণকর। কথা বলার শিষ্টাচার একটি প্রকৃত মুমিনের ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে।
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment