কিয়ামতের লক্ষণসমূহ: যা এখনও ঘটেনি এবং যা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে
কিয়ামতের লক্ষণসমূহ: যা এখনও ঘটেনি এবং যা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে
কিয়ামত ইসলামি আকীদার একটি মৌলিক বিষয়। কুরআন ও সহীহ হাদিসে কিয়ামতের বহু লক্ষণের কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব লক্ষণ আমাদেরকে সতর্ক করে, আত্মসমালোচনায় আহ্বান জানায় এবং ঈমানকে দৃঢ় করতে সাহায্য করে। নিচে সেসব লক্ষণকে দুই ভাগে উপস্থাপন করা হলো — (১) যেগুলো এখনও পূর্ণভাবে ঘটেনি এবং (২) যেগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
✦ প্রথম অংশ: যেসব লক্ষণ এখনও পূর্ণভাবে ঘটেনি
১. অসংখ্য ভূমিকম্প
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের আধিক্য দেখা দেয়।”
— সহীহ আল-বুখারী
হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং ব্যাপকতা ও ধারাবাহিকতার কথাও বোঝানো হয়েছে।
২. সৎ ও ধার্মিক মানুষদের বিলুপ্তি
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ পৃথিবী থেকে সৎ ও উত্তম মানুষদের তুলে নেন এবং নিকৃষ্টদের রেখে দেন।”
এটি মানবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
৩. মুমিনের স্বপ্ন সত্য হয়ে যাওয়া
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে, তখন মুমিনের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না।”
অর্থাৎ, শেষ যুগে সত্যবাদী মানুষের স্বপ্ন অধিকতর সত্য ও স্পষ্ট হবে।
৪. ফোরাত নদী সরে গিয়ে সোনার পাহাড় প্রকাশ
ফোরাত নদী সম্পর্কে নবী ﷺ বলেছেন:
“অচিরেই ফোরাত নদী সরে যাবে এবং সোনার একটি পাহাড় উন্মোচিত হবে। তখন যে সেখানে উপস্থিত থাকবে, সে যেন কিছুই গ্রহণ না করে।”
— সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিম
হাদিসে আরও এসেছে, মানুষ এ সোনার জন্য ভয়াবহ যুদ্ধ করবে।
✦ দ্বিতীয় অংশ: যেসব লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে
১. দুর্যোগের তীব্রতায় মৃত্যু কামনা
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“মানুষ এমন সময়ে পৌঁছাবে যখন কেউ কারও কবরের পাশ দিয়ে গিয়ে বলবে: হায়! আমি যদি তার স্থানে হতাম!”
— সহীহ আল-বুখারী
এটি দুঃসময় ও ফিতনার ব্যাপকতার ইঙ্গিত বহন করে।
২. মিথ্যা নবীদের আবির্ভাব
নবী ﷺ বলেছেন, প্রায় ত্রিশজন বড় মিথ্যাবাদী নবুয়তের দাবি করবে।
ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) বলেন, এখানে সেইসব ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে যারা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে।
৩. আমানতের খিয়ানত ও অযোগ্য নেতৃত্ব
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।”
জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
“যখন দায়িত্ব অযোগ্যদের হাতে দেওয়া হবে।”
এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।
৪. জ্ঞান উঠে যাওয়া ও অজ্ঞতার বিস্তার
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর একটি হলো জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়বে।”
— সহীহ বুখারী ও মুসলিম
এখানে আলেমদের মৃত্যু এবং প্রকৃত দ্বীনি জ্ঞানের বিলুপ্তির কথা বোঝানো হয়েছে।
৫. আরব ভূমি সবুজ হয়ে যাওয়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“আরবদের ভূমি আবার তৃণভূমি ও নদীতে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত কায়েম হবে না।”
— সহীহ মুসলিম
এটি প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
৬. পূর্ববর্তী জাতিদের অন্ধ অনুকরণ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা পূর্ববর্তী জাতিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত করে…”
— সহীহ আল-বুখারী
অর্থাৎ নৈতিক ও সামাজিক বিচ্যুতিতে পূর্ববর্তী বিভ্রান্ত জাতিদের অনুসরণ করা হবে।
৭. সুদের ব্যাপক বিস্তার
হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের আগে রিবা (সুদ) সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।
এ হাদিস বর্ণনা করেছেন আত-তাবারানী এবং সহীহ বলেছেন মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী।
৮. পরিচিতদেরকেই সালাম দেওয়া
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মানুষ কেবল পরিচিতদেরকেই সালাম দেবে — এটিও কিয়ামতের একটি নিদর্শন।
৯. পোশাক পরেও উলঙ্গ নারীরা
হাদিসে এসেছে, এমন নারী আসবে যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ থাকবে।
এ হাদিস বর্ণনা করেছেন আত-তাবারানী এবং সনদকে হাসান বলেছেন মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী।
ইমাম আন-নববী (রহ.) বলেন, এটি নবুওয়তের একটি মু‘জিযা।
✦ উপসংহার
কিয়ামতের লক্ষণসমূহ শুধু ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। যখন আমরা সমাজে এসব নিদর্শনের প্রতিফলন দেখি, তখন আমাদের উচিত—
-
ঈমানকে দৃঢ় করা
-
আমল সংশোধন করা
-
ফিতনা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা
-
কুরআন ও সুন্নাহর পথে ফিরে আসা
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে অবিচল রাখুন এবং কিয়ামতের কঠিন দিন থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment