তাকফিরের বিদ‘আত—উম্মাহর জন্য এক ভয়াবহ বিপদ
তাকফিরের বিদ‘আত—উম্মাহর জন্য এক ভয়াবহ বিপদ
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও বিদ‘আত রয়েছে, যা শুধু ব্যক্তি নয়—পুরো উম্মাহকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক, সবচেয়ে ক্ষতিকারক এবং আল্লাহর ক্রোধ ও কঠিন শাস্তির দিকে সবচেয়ে দ্রুত নিয়ে যায় এমন একটি বিদ‘আত হলো—অন্য মুসলমানকে কাফের (তাকফির) মনে করা।
এই ভ্রান্ত আক্বীদার সূচনা করেছিল খারেজিরা, যারা সালিশের ঘটনার পর খলিফা আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
তাকফির কী?
তাকফির বলতে বোঝায়—
👉 কাউকে নিশ্চিতভাবে মুসলিম প্রমাণিত হওয়ার পরও
👉 তাকে কাফের বা অবিশ্বাসী বলে গণ্য করা।
এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়; বরং এটি একটি শরয়ী সীমালঙ্ঘন, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
তাকফিরের ভয়াবহ পরিণতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকফিরের ব্যাপারে উম্মাহকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
তিনি ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলে: ‘হে কাফের’, তাদের একজনের উপর তা ফিরে যায়।”
— সহীহ বুখারী ও মুসলিম
আরও বলেছেন:
“কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে কুফরের অভিযোগ করলে, সে যদি প্রকৃতপক্ষে কাফের না হয়, তবে অভিযোগটি তার নিজের উপরই ফিরে আসে।”
— সহীহ বুখারী
আরও ভয়াবহ হাদিসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে অভিশাপ দেয়, তা তাকে হত্যা করার শামিল; আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে কাফের বলে, তা তাকে হত্যা করার শামিল।”
— বুখারী ও মুসলিম
ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) বলেন:
“কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে কোনো মুসলিমকে পাপী বা কাফের হিসেবে দোষারোপ করতে নিষেধ করেছে। এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই।”
সালিশের ঘটনা ও খারেজিদের ভ্রান্তি
৩৭ হিজরিতে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধ ছিল মুসলিম ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এই যুদ্ধে ইরাক ও সিরিয়ার প্রায় ৫০,০০০ মুসলমান শহীদ হন, অথচ কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি।
রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ সালিস নিয়োগে সম্মত হয়:
-
আলী (রাঃ) নিযুক্ত করেন আবু মুসা আল-আশ‘আরী (রাঃ)
-
মু‘আবিয়া (রাঃ) নিযুক্ত করেন আমর ইবনে আল-আস (রাঃ)
সালিসরা সিদ্ধান্ত নেন—স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে এবং পরবর্তীতে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।
এই শরয়ী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই খারেজিরা দাবি করে:
“হুকুম একমাত্র আল্লাহর”—এ কথা বলে তারা আলী (রাঃ)-কে কাফের ঘোষণা করে।
এভাবেই তাকফিরের বিদ‘আত জন্ম নেয়।
সাহাবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার
ইতিহাসের কিছু গ্রন্থে সাহাবীদেরকে ক্ষমতালোভী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
ইমাম আবু বকর ইবনে আল-আরাবী (রহ.) এসব অপপ্রচারের জবাবে লিখেছেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ
“আল-আওয়াসিম মিন আল-কাওয়াসিম”, যেখানে তিনি এই সকল মিথ্যাকে খণ্ডন করেছেন।
তাকফির বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান
ইমাম আশ-শাওকানী (রহ.) বলেন:
“আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে অন্য একজন মুসলিমকে কাফের বলবে—যতক্ষণ না তার কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট প্রমাণ থাকে।”
ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফী (রহ.) বলেন:
“কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের বলা সবচেয়ে জঘন্য পাপগুলোর একটি, কারণ এটি তার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের রায় দেওয়ার শামিল।”
কাউকে কাফের বলার ক্ষেত্রে শরয়ী নির্দেশিকা
১️⃣ তাকফির একটি শরয়ী হুকুম
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন:
“কাউকে কাফের বা ফাসিক বলা শরয়ী বিধান; এটি ব্যক্তিগত মতামতের বিষয় নয়। যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কাফের বলেছেন, কেবল সে-ই কাফের।”
২️⃣ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বললেই মূলনীতি ইসলাম
যে ব্যক্তি কালিমা উচ্চারণ করে, তার ব্যাপারে মূলনীতি হলো—
➡️ সে মুসলিম,
➡️ যতক্ষণ না এর বিপরীত নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়।
৩️⃣ বাহ্যিক বিষয় অনুযায়ী বিচার
উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর ঘটনার মাধ্যমে রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—
মানুষের অন্তরের বিচার আল্লাহ করবেন,
আমাদের দায়িত্ব শুধু বাহ্যিক আমল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই ঘটনার পর উসামা (রাঃ) আক্ষেপ করে বলেছিলেন—
“আমি কামনা করছিলাম, যদি আমি ঐ দিনের আগে মুসলিম না হতাম।”
৪️⃣ যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে দেখো…”
— সূরা আল-হুজুরাত: ৬
উপসংহার
তাকফির কোনো সাধারণ ভুল নয়—
এটি রক্তপাত, ফিতনা ও উম্মাহর বিভক্তির দরজা খুলে দেয়।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর পথ হলো—
-
সংযম
-
ইলম
-
ইনসাফ
-
এবং সাহাবীদের মানহাজ আঁকড়ে ধরা
আল্লাহ আমাদেরকে তাকফিরের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন,
বিশুদ্ধ আক্বীদার উপর অবিচল রাখুন
এবং সুন্নাহর আলোতে জীবন পরিচালনার তাওফীক দিন।
আমীন।

Comments
Post a Comment