বিদ‘আত কী এবং কেন তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি?
বিদ‘আত কী এবং কেন তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি?
আল্লাহর দ্বীনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সঠিক আক্বীদা। আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে ইবাদত বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো একটি সংবেদনশীল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিদ‘আত।
অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ বলে থাকেন:
“আমরা তো নামাজ পড়ছি, যিকির করছি, এতে সমস্যা কোথায়? আমরা তো কোনো ঝামেলা করছি না।”
কিন্তু ইসলামে কোনো কাজ ভালো মনে হলেই তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বরং প্রতিটি ইবাদতের জন্য কুরআন ও সুন্নাহ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হয়।
বিদ‘আত কী?
বিদ‘আত বলতে বোঝায়—
➡️ দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো ইবাদত বা পদ্ধতি সংযোজন করা,
➡️ যার কুরআন, সহীহ সুন্নাহ বা সাহাবীদের আমল থেকে কোনো প্রমাণ নেই,
➡️ অথচ সেটিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করা হয়।
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু সংযোজন করলো, যা এর অংশ নয়—তা প্রত্যাখ্যাত।”
— সহীহ বুখারী ও মুসলিম
উদাহরণ: আল-ক্বিরাআত আস-সামাদিয়্যাহ
কিছু তরীকাহ ও গোষ্ঠীর মধ্যে একটি প্রচলিত আমল হলো—
🔸 সূরা আল-ইখলাস এক লক্ষ বার পাঠ করা,
🔸 এবং এটিকে “জাহান্নাম থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা” বলা।
এখানে বিষয়টি একটু গভীরভাবে বোঝা দরকার।
যা সুন্নাহসম্মত:
সূরা আল-ইখলাস পড়া একটি বৈধ যিকির
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ দশবার পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন।”
— মুসনাদ আহমাদ, সহীহ (আল-আলবানী)
যা বিদ‘আত:
❌ এক লক্ষ বার নির্দিষ্ট করে বাধ্যতামূলক করা
❌ এটিকে “নিশ্চিত মুক্তি” বলে নামকরণ করা
❌ এমন ফজিলত নির্ধারণ করা যার কোনো দলিল নেই
এই অংশটুকুই বিদ‘আত, কারণ ইবাদতের সংখ্যা, পদ্ধতি ও ফজিলত নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর।
এ কারণেই একে বলা হয় আংশিক বিদ‘আত—মূল আমল বৈধ, কিন্তু নির্দিষ্টকরণ ও অতিরঞ্জন বিদ‘আত।
কেন বিদ‘আত এত ভয়ংকর?
বিদ‘আত শুধু একটি ভুল আমল নয়; বরং এটি একটি ভয়ংকর আক্বীদাগত বিপদ।
বিদ‘আতকারী পরোক্ষভাবে দাবি করে যে—
দ্বীনে কিছু অপূর্ণ ছিল
নবী ﷺ তা শেখাননি
সে নিজে নাকি দ্বীনের কল্যাণ বেশি বোঝে
অথচ আল্লাহ বলেন:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছি।”
— সূরা আল-মায়েদাহ: ৩
সুন্নাহ অনুসরণের সঠিক অর্থ
সুন্নাহ মানে শুধু—
✔️ রাসূল ﷺ যা করেছেন তা করা
✔️ রাসূল ﷺ যা করেননি তা থেকে বিরত থাকা
সুন্নাহর বাইরে গিয়ে “ভালো মনে হয়” বলে কিছু করা মানেই তা আল্লাহর কাছে ভালো হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিদ‘আত থেকে বাঁচার কিছু মূলনীতি
১️⃣ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যাচাই
যে কোনো আমল গ্রহণের আগে প্রশ্ন করুন:
এর প্রমাণ কোথায়?
নবী ﷺ বা সাহাবীরা কি এটি করেছেন?
২️⃣ ইবাদতের মূলনীতি মনে রাখা
➡️ দুনিয়ার ক্ষেত্রে সব কিছু হালাল, যতক্ষণ না হারাম প্রমাণিত
➡️ ইবাদতের ক্ষেত্রে সব কিছু হারাম, যতক্ষণ না বৈধ প্রমাণিত
৩️⃣ সাহাবীদের পথ আঁকড়ে ধরা
নবী ﷺ বলেছেন:
“আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো।”
4️⃣ দ্বীনি জ্ঞান অর্জন
বিদ‘আত থেকে বাঁচার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো সহীহ ইলম।
নবী ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহ যাকে কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।”
— বুখারী ও মুসলিম
উপসংহার
ইসলাম আবেগ নয়—ইসলাম দলিল।
ইবাদত সংখ্যা নয়—ইবাদত আনুগত্য।
আল্লাহ আমাদেরকে যেন—
বিদ‘আতের অন্ধকার থেকে রক্ষা করেন
সুন্নাহর আলোয় জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দেন
এবং সাহাবীদের পথে দৃঢ় রাখেন
আমীন

Comments
Post a Comment