কিয়ামতের কম্পন ও আমলের হিসাব: সূরা আয-যালযালাহর শিক্ষা
কিয়ামতের কম্পন ও আমলের হিসাব: সূরা আয-যালযালাহর শিক্ষা
পবিত্র Qur'an-এর ৯৯ নম্বর সূরা, Surah Az-Zalzalah, একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী মক্কী সূরা। মাত্র আটটি আয়াতের এই সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য, পৃথিবীর সাক্ষ্যদান এবং মানুষের আমলের সূক্ষ্ম হিসাবের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে।
কিয়ামতের ভয়াবহ কম্পন
সূরার শুরুতেই আল্লাহ বলেন, যখন পৃথিবী তার চূড়ান্ত ভূমিকম্পে প্রকম্পিত হবে এবং তার ভেতরের বোঝা বের করে দেবে। এই কম্পন সাধারণ ভূমিকম্প নয়; এটি হবে কিয়ামতের সূচনালগ্নের এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
“হে মানবজাতি, তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।”
— Surah Al-Hajj (২২:১)
পৃথিবী তার “বোঝা” বের করে দেবে—অর্থাৎ মৃত মানুষদের এবং ভেতরে সঞ্চিত সবকিছু উগরে দেবে। মানুষ হতবাক হয়ে বলবে, “এর কী হলো?” এটি হবে বিস্ময় ও আতঙ্কের প্রশ্ন।
পৃথিবীর সাক্ষ্যদান
সেদিন পৃথিবী তার সংবাদ বর্ণনা করবে, কারণ তার প্রভু তাকে আদেশ করবেন। হাদিসে এসেছে, Abu Huraira (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: পৃথিবী সাক্ষ্য দেবে—অমুক ব্যক্তি অমুক দিনে তার উপর কী কাজ করেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রতিটি কাজ রেকর্ড হচ্ছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলি, যে জমিনে হাঁটি—সেই জমিনই একদিন আমাদের বিরুদ্ধে বা পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।
বিচ্ছিন্ন দলে প্রত্যাবর্তন
কিয়ামতের দিন মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বের হবে—কেউ জান্নাতের দিকে, কেউ জাহান্নামের দিকে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
“সেদিন তারা বিভক্ত হবে।”
— Surah Ar-Rum (৩০:৪৩)
এ বিভাজন হবে তাদের আমলের ভিত্তিতে। দুনিয়ার পরিচয়, পদ-মর্যাদা বা সম্পদ সেখানে কোনো কাজে আসবে না।
অণু পরিমাণ আমলের হিসাব
এই সূরার সবচেয়ে আলোচিত আয়াত:
“যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।”
এখানে “যররা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ ক্ষুদ্রতম পিঁপড়া বা অত্যন্ত ক্ষুদ্র বস্তু। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের পরমাণুকে বোঝায় না; বরং মানুষের বোধগম্য ক্ষুদ্রতার উপমা।
এই আয়াতের গুরুত্ব এত বেশি যে Abdullah ibn Masud (রাঃ) একে কুরআনের সবচেয়ে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত আয়াতগুলোর একটি বলেছেন। এমনকি সাহাবায়ে কিরাম সামান্য দানকেও হালকা মনে করতেন না। একটি আঙ্গুর দান করেও তারা বলতেন—এটিও ওজনদার হতে পারে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও অবিচার করেন না।”
— Surah An-Nisa (৪:৪০)
ছোট কাজের গুরুত্ব
এই সূরা আমাদের শেখায়—
ছোট ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করা যাবে না।
ছোট পাপকেও হালকা ভাবা যাবে না।
ধারাবাহিক ছোট কাজ বড় রূপ নেয়।
আল্লাহর সামনে প্রতিটি কাজের হিসাব আছে।
মানুষ কখনো মনে করে—একটি খেজুর দান করলে কী হবে? অথবা একটি মিথ্যা বললে কী ক্ষতি? কিন্তু আল্লাহ জানান—সবকিছুই লিপিবদ্ধ হচ্ছে।
আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা
আল্লাহ যখন পৃথিবীকে আদেশ করবেন কথা বলতে, তখন তা কথা বলবে। অন্যত্র তিনি বলেন:
“তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন: তোমরা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আসো। তারা বলল: আমরা স্বেচ্ছায় এলাম।”
— Surah Fussilat (৪১:১১)
এতে প্রমাণ হয়, আল্লাহ জড়বস্তুকেও আদেশ করতে সক্ষম এবং তারা তাঁর নির্দেশ মান্য করে।
উপসংহার
সূরা আয-যালযালাহ আমাদের সামনে এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে—একদিন পৃথিবী কাঁপবে, মানুষ বিস্মিত হবে, জমিন সাক্ষ্য দেবে, আর প্রতিটি কাজের পূর্ণ হিসাব হবে।
এই সূরা আমাদের শেখায়:
দায়িত্বশীল জীবনযাপন
ছোট সৎকর্মে উৎসাহ
ছোট পাপ থেকে সতর্কতা
কিয়ামতের প্রস্তুতি
মাত্র আটটি আয়াত—কিন্তু একটি পূর্ণ জীবনদর্শন। যদি মানুষ এই সূরার শিক্ষা অন্তরে ধারণ করে, তবে তার চরিত্র, আচরণ এবং দুনিয়াবি জীবন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হতে পারে।
Comments
Post a Comment