ঈমান ও কুফরের পরিণতি: সূরা আল-বাইয়্যিনাহর আলোকে মানবতার প্রকৃত মানদণ্ড

 

ঈমান ও কুফরের পরিণতি: সূরা আল-বাইয়্যিনাহর আলোকে মানবতার প্রকৃত মানদণ্ড

মানবজাতির মর্যাদা কীসে নির্ধারিত হয়? সম্পদ, বংশ, জ্ঞান, নাকি ক্ষমতায়? ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে তার ঈমান ও আমলের উপর। এই মৌলিক সত্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে Qur'an-এর সূরা Surah Al-Bayyinah-এ (৯৮:৬–৮)। এই আয়াতগুলো মানবজাতিকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করে—একদল “নিকৃষ্টতম সৃষ্টি”, আরেকদল “সর্বোত্তম সৃষ্টি”।


কুফরের পরিণতি: নিকৃষ্টতার কারণ

আয়াতে বলা হয়েছে, আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কুফর করেছে তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে এবং তারাই “শরুল বারিয়্যাহ”—সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের নিকৃষ্ট বলা হয়েছে কেবল অবিশ্বাসের কারণে নয়, বরং হিদায়াত পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করার কারণে। আহলে কিতাবদের কাছে আসমানি কিতাব ছিল, যাতে হেদায়েত ও আলো ছিল। মুশরিকদের পূর্বপুরুষরা তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা তা অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের অপরাধ সাধারণ অজ্ঞতার চেয়ে অনেক গুরুতর।

এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়—সত্য জানার পর তা অস্বীকার করা মানুষের আত্মাকে নিকৃষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়।

ঈমান ও সৎকর্ম: শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত মানদণ্ড

অন্যদিকে, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে বলা হয়েছে “খাইরুল বারিয়্যাহ”—সৃষ্টির সেরা। এখানে শুধু ঈমান নয়, বরং ঈমানের সাথে আমল যুক্ত করা হয়েছে। কারণ প্রকৃত ঈমান মানুষের চরিত্র, আচরণ ও কর্মে প্রতিফলিত হয়।

এই শ্রেষ্ঠত্ব বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়। এটি নির্ভর করে হৃদয়ের বিশ্বাস ও জীবনের কর্মপদ্ধতির উপর। তাই ইসলামে একজন সাধারণ মানুষও ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হতে পারে।

জান্নাতু ‘আদন’: চিরস্থায়ী পুরস্কার

মুমিনদের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ ঘোষণা করেন—তাদের জন্য রয়েছে “জান্নাতু ‘আদন”, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত এবং যেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।

“আদন” শব্দের অর্থ স্থায়ী আবাস। অর্থাৎ এটি ক্ষণস্থায়ী সুখ নয়; বরং চিরন্তন শান্তি ও নিরাপত্তা। পৃথিবীর সব সুখ সাময়িক, কিন্তু জান্নাতের আনন্দ অনন্ত।

সর্বোচ্চ নিয়ামত: আল্লাহর সন্তুষ্টি

আয়াতে আরও বলা হয়েছে—“আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।”

তাফসিরকারগণ বলেন, জান্নাতের সমস্ত নিয়ামতের চেয়েও বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। কারণ বস্তুগত সুখের চেয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অধিক মর্যাদাপূর্ণ। একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—তার রব তার প্রতি সন্তুষ্ট।

বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা মানে হলো—তিনি যা ফয়সালা করেন, তা আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়া। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্ট হওয়া মানে হলো—তিনি আর কখনও সেই বান্দার উপর অসন্তুষ্ট হবেন না।

তাকওয়া: এই পুরস্কারের চাবিকাঠি

শেষ আয়াতে বলা হয়েছে—“এটি তার জন্য, যে তার প্রভুকে ভয় করে।” এখানে ভয় বলতে আতঙ্ক নয়; বরং শ্রদ্ধা, সচেতনতা ও জবাবদিহিতার অনুভূতি। এই তাকওয়াই মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে এবং সৎকর্মে উৎসাহিত করে।

উপসংহার

সূরা আল-বাইয়্যিনাহ আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য অস্বীকার করা মানুষকে নিকৃষ্টতার দিকে নিয়ে যায়, আর আন্তরিক ঈমান ও সৎকর্ম মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে।

অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের অন্তর ও আমল পর্যালোচনা করা—আমরা কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই? নিকৃষ্টতার, নাকি শ্রেষ্ঠত্বের?

এই আয়াতগুলো শুধু পরকালের বর্ণনা নয়; বরং দুনিয়ার জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

Comments

Popular posts from this blog

ইফতার প্রস্তুতি: ইফতারের আগে কী করা উচিত?

লাইলাতুল কদর বেজোড় রাতে খোঁজার নির্দেশ