যে আত্মাকে শুদ্ধ করে, সে জান্নাতের যোগ্য হয় — আর যে আত্মাকে মন্দে নিমজ্জিত করে, সে জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত হয়।
সূরা আশ-শামস — আত্মার পরিশুদ্ধি ও নৈতিক সাফল্যের শিক্ষা
সূত্র: সূরা আশ-শামস (সূরা ৯১: আয়াত ১–১০)
অবতীর্ণ স্থান: মক্কা
আয়াতসমূহ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“শপথ সূর্যের ও তার আলোর,
আর চাঁদের, যখন তা তার অনুসরণ করে,
আর দিনের, যখন তা সূর্যকে উদ্ভাসিত করে,
আর রাতের, যখন তা সূর্যকে ঢেকে ফেলে,
আর আকাশের, যিনি তা নির্মাণ করেছেন,
আর পৃথিবীর, যিনি তা বিস্তৃত করেছেন,
আর আত্মার, যিনি তা সুঠামভাবে গঠন করেছেন,
এবং তাকে তার পাপ ও ধার্মিকতার জ্ঞান দান করেছেন,
সে সফল হয়েছে যে আত্মাকে পবিত্র করেছে,
আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে আত্মাকে কলুষিত করেছে।”
[আশ-শামস ৯১:১–১০]
আয়াতের সারমর্ম ও ভাষ্য
১. সূর্য ও চন্দ্রের শপথ
আল্লাহ সূর্যের আলো ও তেজের শপথ করেছেন, কারণ সূর্য আল্লাহর শক্তি ও প্রজ্ঞার এক মহা নিদর্শন।
চাঁদের শপথ করা হয়েছে, কারণ তা সূর্যের আলো ধার নিয়ে রাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে।
দিন ও রাতের এই পরিবর্তনই আল্লাহর পরিকল্পনা ও ভারসাম্যের প্রতীক।
২. আকাশ ও পৃথিবীর শপথ
আল্লাহ আকাশের শপথ করেছেন, যাকে তিনি সুবিন্যস্তভাবে নির্মাণ করেছেন।
তিনি পৃথিবীর শপথ করেছেন, যাকে তিনি জীবজন্তুর বাসযোগ্য করে প্রসারিত করেছেন।
এই নিদর্শনগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সৃষ্ট সবকিছু নিখুঁত ভারসাম্যে স্থাপিত।
৩. আত্মার শপথ
এরপর আল্লাহ মানুষের আত্মার শপথ করেছেন। এটি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টি।
তিনি বলেন — “আর আত্মার শপথ এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন।”
অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তার মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, অনুভূতি, ভালো-মন্দ চিনার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।
আল্লাহ বলেন, “তিনি তাকে তার পাপ ও ধার্মিকতার জ্ঞান দান করেছেন।”
অর্থাৎ, প্রতিটি মানুষের মধ্যে আল্লাহ এমন বোধ সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে বুঝতে সাহায্য করে কোনটি ভালো ও কোনটি মন্দ।
৪. সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রকৃত মানদণ্ড
এরপর আল্লাহ বলেন:
“সে সফল হয়েছে যে আত্মাকে পবিত্র করেছে,
আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে আত্মাকে কলুষিত করেছে।”
অর্থাৎ, প্রকৃত সাফল্য কোনো সম্পদ, পদমর্যাদা বা বাহ্যিক কৃতিত্বে নয়; বরং আত্মার পরিশুদ্ধি ও পাপ থেকে মুক্তির মধ্যেই নিহিত।
যে ব্যক্তি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে, পাপ থেকে দূরে থাকে, ও আল্লাহর আনুগত্যে জীবন যাপন করে, সে সফল।
আর যে ব্যক্তি নফসের অনুসরণে চলে, অন্যায়ের পথে চলে, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত।
আত্মার তাযকিয়া (পরিশুদ্ধি) ও দাসত্ব
“তাযকিয়াতুন নাফস” মানে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা — অর্থাৎ, অহংকার, শিরক, হিংসা, লোভ ও গুনাহ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি বিনম্র করা।
এটি ইসলামে নৈতিক উন্নতির মূলভিত্তি।
আত্মার তাযকিয়া দুইভাবে হয়:
-
ইতিবাচক তাযকিয়া: আত্মাকে শুদ্ধ করা, আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত করা।
-
নিন্দনীয় তাযকিয়া: নিজের প্রশংসা করা, অহংকার করা — যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়।
আল্লাহ বলেন:
“সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না।”
(সূরা আন-নাজম ৫৩:৩২)
৫. মানবজীবনের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব
এই সূরায় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে —
আল্লাহ তাকে সৎ ও অসৎ উভয় পথ দেখিয়ে দিয়েছেন।
যেমন, “আর আমরা তাকে দুই পথ দেখিয়ে দিয়েছি।” (সূরা আল-বালাদ ৯০:১০)
এবং “নিশ্চয়ই আমরা তাকে পথ দেখিয়েছি, সে কৃতজ্ঞ হোক বা অকৃতজ্ঞ হোক।” (সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)
অর্থাৎ, মানুষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের দায়ভার তার নিজের উপরই বর্তায়।
৬. সূরা আশ-শামস থেকে মূল শিক্ষা
১. আল্লাহর শপথ করা প্রতিটি বস্তুই তাঁর শক্তি, প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার নিদর্শন।
২. আত্মা আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যা ভালো ও মন্দের জ্ঞান ধারণ করে।
৩. প্রকৃত সাফল্য আত্মার পরিশুদ্ধি ও নৈতিক শুদ্ধতায়।
৪. আত্মাকে কলুষিত করা মানে — নফসের দাসত্বে আবদ্ধ হওয়া ও পাপে লিপ্ত থাকা।
৫. আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু সে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও অর্পণ করেছেন।
৬. আত্মার পবিত্রতা ছাড়া বাহ্যিক কোনো অর্জনই প্রকৃত মুক্তি এনে দিতে পারে না।
সংক্ষিপ্ত উপসংহার
সূরা আশ-শামস মানুষকে আত্মপর্যালোচনা ও নৈতিক উন্নতির শিক্ষা দেয়।
যেমন সূর্য অন্ধকার দূর করে আলোক ছড়ায়, তেমনি পবিত্র আত্মা মানুষকে আল্লাহর নিকট পৌঁছানোর আলোকিত পথ দেখায়।
যে আত্মাকে শুদ্ধ করে, সে জান্নাতের যোগ্য হয় — আর যে আত্মাকে মন্দে নিমজ্জিত করে, সে জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত হয়।
Comments
Post a Comment