আত্মসংযম, দান, দয়া ও ঈমানের শিক্ষা
আত্মসংযম, দান, দয়া ও ঈমানের শিক্ষা
আয়াতসমূহ
আল্লাহ বলেন, কিন্তু সে কঠিন পথ অতিক্রম করেনি। আর তুমি কি জানো সেই কঠিন পথ কী? তা হলো একজন দাসকে মুক্ত করা, অথবা তীব্র ক্ষুধার দিনে একজন নিকটাত্মীয় এতিম কিংবা অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাদ্য দান করা। এরপর যারা ঈমান এনেছে, একে অপরকে ধৈর্য ও দয়ার উপদেশ দিয়েছে, তারাই ডানদিকের সঙ্গী। আর যারা আমার নিদর্শন অস্বীকার করেছে, তারাই বামদিকের সঙ্গী; তাদের উপর থাকবে আগুন ঘেরা।
সূরা আল-বালাদ ৯০:১১–২০
আয়াতের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
আকাবা শব্দের অর্থ হলো দুর্গম পাহাড়ি পথ বা এমন একটি রাস্তা যা পার হওয়া কঠিন। আল্লাহ এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন মানুষের নফস, খেয়াল-খুশি ও শয়তানের প্রলোভনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বোঝাতে। অর্থাৎ, কঠিন পথ হলো সেই নৈতিক ও আত্মিক সংগ্রাম যেখানে একজন মানুষ নিজের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতার বিপরীতে সৎকর্মের দিকে এগিয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন, সে কেন কঠিন পথটি অতিক্রম করল না? অর্থাৎ, কেন সে নিজের নফসকে পরাস্ত করে সৎকর্মে প্রবেশ করল না?
কঠিন পথ আসলে কী
আল্লাহ নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন যে কঠিন পথ মানে কষ্ট ভোগ নয়, বরং মানবিক দায়িত্বে এগিয়ে আসা।
একজন দাসকে মুক্ত করা
ইসলামের প্রথম যুগে দাসপ্রথা ছিল সমাজে প্রচলিত বাস্তবতা। ইসলাম দাস মুক্তিকে সর্বোত্তম সৎকর্ম হিসেবে ঘোষণা করে ধীরে ধীরে এই প্রথাকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করে, আল্লাহ তার প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর অনেক নির্যাতিত দাসকে মুক্ত করেছিলেন যেমন বিলাল, আমির ইবনে ফুহাইরা, উম্মে উবাইস প্রমুখ। তাঁর পিতা বলেছিলেন, তুমি দুর্বল দাসদের কেন মুক্ত করছো? তিনি উত্তরে বলেন, আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করি।
ক্ষুধার দিনে খাওয়ানো
এটি দানের সবচেয়ে কঠিন রূপ, কারণ নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে দেওয়া প্রকৃত আত্মসংযমের নিদর্শন।
আল্লাহ বলেন, হে নবী, তারা জিজ্ঞাসা করে তারা কী ব্যয় করবে? বল, যা কিছুই তোমরা ব্যয় করো তা যেন নিকটাত্মীয়, এতিম, অভাবী ও পথিকের জন্য হয়। (সূরা আল-বাকারা ২:২১৫)
নিকটাত্মীয় এতিম ও অভাবীকে দান
এখানে এতিম বলতে এমন এতিমকে বোঝানো হয়েছে যার সঙ্গে দাতা ব্যক্তির আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। আর মিসকীন বলতে এমন অভাবী মানুষকে বোঝানো হয়েছে যার কিছুই নেই। অর্থাৎ দান করার এই দুটি রূপ কেবল অর্থনৈতিক সাহায্য নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধিরও একটি মাধ্যম।
এরপর ঈমান, ধৈর্য ও দয়া
আল্লাহ বলেন, এরপর সে যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে, একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে ও দয়ার উপদেশ দিয়েছে।
দাস মুক্ত করা বা দান করা যথেষ্ট নয়, বরং এর সঙ্গে থাকতে হবে তিনটি গুণ
এক ঈমান – আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও পরকালের জবাবদিহির চেতনা
দুই ধৈর্য – বিপদে স্থির থাকা, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর আদেশে অবিচল থাকা
তিন দয়া – মানুষের প্রতি সহানুভূতি, করুণা ও সাহায্যের মানসিকতা
যাদের মধ্যে এই গুণগুলো থাকবে, তারা হবে আশহাবুল মাইমানাহ অর্থাৎ ডানদিকের সৌভাগ্যবান।
আশহাবুল মাইমানাহ ও আশহাবুল মাশামাহ
আল্লাহ বলেন, তারা ডানদিকের সঙ্গী। অর্থাৎ কিয়ামতের দিনে যাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তারা সফল ও মুক্তিপ্রাপ্ত। মাইমানাহ শব্দটি এসেছে ইয়ামিন শব্দ থেকে, যার অর্থ বরকত ও সৌভাগ্য।
অন্যদিকে, যারা আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করেছে তারা হলো আশহাবুল মাশামাহ। তারা বামদিকের লোক, অর্থাৎ অশুভ ও ব্যর্থ মানুষ। তাদের উপর থাকবে বন্ধ আগুন, যার থেকে মুক্তি নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষা
এক কঠিন পথ মানে নিজের নফস, লোভ ও অহংকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
দাস মুক্ত করা, এতিম ও অভাবীদের দান করা সমাজে ন্যায় ও দয়ার প্রতিষ্ঠা করে
ঈমান, ধৈর্য ও দয়া একজন মুসলমানের চরিত্রের মূল ভিত্তি
পরকালের সাফল্য নির্ভর করে বিশ্বাস, মানবতা ও ধৈর্যের সংমিশ্রণের উপর
সংক্ষিপ্ত অনুপ্রেরণা
কঠিন পথ আসলে সেই রাস্তা, যা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের কল্যাণে এগিয়ে যায়। এটি কেবল পাহাড় নয়, বরং নফসের পর্বত, যার ওপারে রয়েছে জান্নাতের প্রশান্তি।

Comments
Post a Comment