তাওয়াসসুল (তাওয়াসসুলের সঠিক ধারণা ও বিভাজন)
তাওয়াসসুল (তাওয়াসসুলের সঠিক ধারণা ও বিভাজন)
— ইসলামী আক্বীদাহর আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
লিখেছেন: Sunnah Seekers Team
ভূমিকা
ইসলামে ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা। মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে, যেমন দোয়া, সৎকর্ম, তাওহীদ, তাওবা ইত্যাদি।
এই নৈকট্য অর্জনের পদ্ধতিকেই বলা হয় তাওয়াসসুল (توسل) — অর্থাৎ, “উপায় বা মাধ্যম গ্রহণ করা যার দ্বারা আল্লাহর কাছে পৌঁছানো যায়।”
কিন্তু ইসলামী শরীয়ত পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, কোন কোন উপায়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ বৈধ এবং কোনগুলো অবৈধ বা বিদআত।
তাওয়াসসুলের প্রধান দুই বিভাগ
তাওয়াসসুল দুই শ্রেণীতে বিভক্ত:
-
বিধিসিদ্ধ (নির্ধারিত) তাওয়াসসুল — যা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
-
বিধিবহির্ভূত (নির্ধারিত নয়) তাওয়াসসুল — যা শরীয়তের কোনো ভিত্তি নেই এবং শিরকের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
প্রথম শ্রেণী: নির্ধারিত তাওয়াসসুল
এগুলো সেই সকল পদ্ধতি যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ দ্বারা অনুমোদিত এবং সাহাবায়ে কেরাম তা অনুসরণ করেছেন। নিচে ছয়টি প্রমাণিত পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১️⃣ আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে তাওয়াসসুল
আল্লাহ বলেন:
“আর আল্লাহর জন্যই সর্বোত্তম নামসমূহ; সুতরাং তাঁকে সেই নামসমূহ দ্বারা ডাকো।”
— [আল-আ‘রাফ ৭:১৮০]
অর্থাৎ, দোয়া করার সময় আল্লাহর নির্দিষ্ট নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছে চাওয়া। যেমন:
-
“হে আর-রহমান, আমাকে রহম করুন।”
-
“হে আল-গফুর, আমার পাপ ক্ষমা করুন।”
-
“হে আল-হাকীম, আমাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করুন।”
এটি আল্লাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাওহীদের প্রকাশ।
২️⃣ ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে তাওয়াসসুল
কুরআনে মুমিনদের দোয়া বর্ণিত হয়েছে:
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা একজন আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি — ‘তোমাদের প্রভুর প্রতি ঈমান আনো’ — এবং আমরা ঈমান এনেছি...”
— [আলে ইমরান ৩:১৯৩]
তারা তাদের ঈমান ও সৎকর্মের উসিলায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
🔹 অনুরূপভাবে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত সেই বিখ্যাত হাদিসে তিন ব্যক্তি গুহায় আটকা পড়ে গিয়েছিল।
প্রত্যেকে তাদের কোনো একটি খাঁটি সৎকর্ম স্মরণ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, এবং আল্লাহ তাদের মুক্তি দেন।
এটি প্রমাণ করে — সৎকর্মের মাধ্যমে তাওয়াসসুল শরীয়তসম্মত।
৩️⃣ তাওহীদের মাধ্যমে তাওয়াসসুল
নবী ইউনুস (আঃ) যখন মাছের পেটে বন্দী ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন:
“তুমি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কেউ নেই; তুমি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।”
— [আল-আম্বিয়া ২১:৮৭–৮৮]
এই দোয়া “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা” — আল্লাহর একত্ববাদে পরিপূর্ণ একটি তাওহীদের ঘোষণা।
এর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট দোয়া করা তাওয়াসসুলের অন্যতম সর্বোচ্চ রূপ।
৪️⃣ নিজের দুর্বলতা ও প্রয়োজন প্রকাশের মাধ্যমে তাওয়াসসুল
নবী আইয়ুব (আঃ) কষ্ট ও রোগে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর কাছে বলেছিলেন:
“নিশ্চয়ই, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর তুমি দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।”
— [আল-আম্বিয়া ২১:৮৩]
🔸 এখানে তিনি আল্লাহর দরবারে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন, যা বিনয়, তাওয়াক্কুল এবং তাওয়াসসুলের নিদর্শন।
৫️⃣ জীবিত ধার্মিকদের দোয়ার মাধ্যমে তাওয়াসসুল
সহিহ বুখারির হাদিসে আছে:
খরার সময় উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন আল্লাহর কাছে নবী ﷺ-এর চাচা আল-আব্বাস (রাঃ)-এর দোয়ার মাধ্যমে এবং বলতেন —
“হে আল্লাহ, আমরা আমাদের নবীর দোয়ার মাধ্যমে তোমার সাহায্য প্রার্থনা করতাম, আর তুমি আমাদের বৃষ্টি দান করতে। এখন আমরা তাঁর চাচার দোয়ার মাধ্যমে তোমার সাহায্য প্রার্থনা করছি; সুতরাং আমাদের বৃষ্টি দান করো।”
এটি প্রমাণ করে — জীবিত ধার্মিক ব্যক্তির দোয়া প্রার্থনা করা বৈধ, কিন্তু মৃত ব্যক্তির কাছে তা চাওয়া জায়েজ নয়।
৬️⃣ পাপ স্বীকার করে তাওয়াসসুল
নবী মূসা (আঃ) বলেছেন:
“হে আমার প্রভু, আমি নিজের উপর জুলুম করেছি, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।”
— [আল-কাসাস ২৮:১৬]
এবং নবী ইউনুস (আঃ) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।”
— [আল-আম্বিয়া ২১:৮৭]
নিজের পাপ স্বীকার করে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করা তাওয়াসসুলের এক বৈধ রূপ, যা আত্মসমর্পণ ও তাওবা প্রকাশ করে।
দ্বিতীয় শ্রেণী: নির্ধারিত নয় বা নিষিদ্ধ তাওয়াসসুল
এগুলো এমন পদ্ধতি যা কুরআন ও সুন্নাহতে অনুমোদিত নয়। এগুলো মানুষকে বিদআত ও কখনো শিরকের দিকে টেনে নেয়।
১. মৃতদের মাধ্যমে তাওয়াসসুল
যেমন, কেউ কোনো মৃত নবী বা ওলির কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে:
“হে অমুক, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো” — বা সরাসরি তাদের কাছে কিছু চাওয়া।
এটি আল্লাহর তাওহীদের পরিপন্থী, কারণ মৃত ব্যক্তি আর শুনতে বা সাড়া দিতে সক্ষম নয়।
আল্লাহ বলেন:
“যাদের তোমরা আল্লাহ ছাড়া ডাকো, তারা খেজুর বীজের আবরণের মালিকও নয়... যদি তোমরা তাদের ডাকো, তারা শুনবে না, আর শুনলেও সাড়া দেবে না।”
— [ফাতির ৩৫:১৩–১৪]
সাহাবারা কখনো নবী ﷺ-এর কবরের দিকে মুখ করে দোয়া করেননি; বরং কেবলার দিকে মুখ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন।
২. নবীর মর্যাদা (জাহ) দ্বারা তাওয়াসসুল
কিছু মানুষ বলে:
“হে আল্লাহ, আমি তোমার নবীর মর্যাদা বা অবস্থানের উসিলায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি।”
কিন্তু —
-
সাহাবারা এমনটি করেননি, যদিও তাঁরা নবীর মর্যাদা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন।
-
ইবাদতের মূলনীতি হলো, যা প্রমাণিত নয়, তা বাতিল।
-
অন্যের মর্যাদা দিয়ে দোয়া মানে অন্যের আমল দ্বারা চাওয়া, অথচ আল্লাহ বলেন:
“মানুষের জন্য কেবল তার নিজ প্রচেষ্টাই রয়েছে।”
— [আন-নাজম ৫৩:৩৯]
“আমার মর্যাদার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো” — এই কথাটি কোনো সহিহ হাদিস নয়, বরং জাল (fabricated)।
৩. সৃষ্ট সত্তার “সত্তা” বা “অধিকার” দ্বারা তাওয়াসসুল
যেমন কেউ বলে:
“হে আল্লাহ, আমি তোমার নবীর সত্তার উসিলায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি”
অথবা
“তোমার ওলির অধিকারের উসিলায় আমার প্রয়োজন পূরণ করো।”
এগুলোও নিষিদ্ধ কারণ:
-
এর কোনো শরীয় প্রমাণ নেই — নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করবে যা আমাদের বিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।”
— [সহিহ বুখারি] -
এটি শিরকের দিকে নিয়ে যায়, কারণ এতে ধারণা তৈরি হয় যে মৃত ব্যক্তি বা ওলি আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই উপকার বা ক্ষতি করতে পারে।
-
আল্লাহর উপর কারোরই কোনো “অধিকার” নেই — তিনি যা চান কেবল তাই ঘটান।
তাওয়াসসুল একটি গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাগত বিষয়। ইসলামে এর সীমা ও নিয়ম পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত।
✅ বৈধ তাওয়াসসুল:
-
আল্লাহর নাম ও গুণাবলী দ্বারা
-
ঈমান ও সৎকর্মের দ্বারা
-
তাওহীদের দ্বারা
-
নিজের দুর্বলতা ও প্রয়োজন প্রকাশের দ্বারা
-
জীবিত ধার্মিকদের দোয়ার দ্বারা
-
পাপ স্বীকারের দ্বারা
❌ অবৈধ তাওয়াসসুল:
-
মৃতদের মাধ্যমে
-
নবীর মর্যাদা বা “জাহ” দ্বারা
-
সৃষ্ট সত্তার সত্তা বা অধিকারের মাধ্যমে
“ইবাদত ও দোয়ায় কেবল সেই উপায় গ্রহণ করো, যা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন ও সুন্নাহতে প্রমাণিত নয় এমন তাওয়াসসুল হলো বিদআত, আর বিদআত মানুষকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়।”
লিখেছেন: Sunnah Seekers Team
সূত্র: ইসলামী আক্বীদাহ, খণ্ড ৫ — তাওয়াসসুল (আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়) ও এর বিভাগসমূহ

Comments
Post a Comment