Posts

সূরা আত-তিন: মানুষের মর্যাদা ও পতনের বাস্তবতা

Image
  সূরা আত-তিন: মানুষের মর্যাদা ও পতনের বাস্তবতা কুরআনের সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ সূরাগুলোর একটি হলো সূরা আত-তিন । এটি একটি মক্কী সূরা , যা এমন এক সময়ে অবতীর্ণ হয় যখন ঈমান, আখিরাত ও নৈতিকতার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। এই সূরাটি মানুষকে তার আসল মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সতর্ক করে দেয়—এই মর্যাদা হারানো কতটা ভয়াবহ হতে পারে। আল্লাহর শপথ ও তার তাৎপর্য সূরার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শপথ করেছেন—ডুমুর, জলপাই, সিনাই পর্বত এবং নিরাপদ নগরী মক্কা। এগুলো কেবল ফল বা স্থান নয়; বরং ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নবীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত পবিত্র নিদর্শন। ডুমুর ও জলপাই ইঙ্গিত করে আশ-শাম অঞ্চলকে, যেখান থেকে হযরত ঈসা (আ.)-এর নবুওয়াত শুরু হয়েছিল। সিনাই পর্বত সেই পবিত্র স্থান, যেখানে হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আর নিরাপদ নগরী মক্কা হলো মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর রিসালাতের সূচনাস্থল। এই শপথগুলো প্রমাণ করে—যে বার্তা আসছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সত্য। মানুষ: সর্বোত্তম সৃষ্টি আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম গঠ...

সূরা আশ-শারহ: কষ্টের মাঝেই লুকিয়ে থাকা স্বস্তির মহাসংবাদ

  সূরা আশ-শারহ: কষ্টের মাঝেই লুকিয়ে থাকা স্বস্তির মহাসংবাদ কুরআনের ছোট কিন্তু অত্যন্ত গভীর অর্থবহ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা আশ-শারহ (আলাম নাশরাহ) একটি অনন্য সূরা। এটি একটি মক্কী সূরা , অর্থাৎ হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ, এমন এক সময় যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর অনুসারীরা চরম কষ্ট, নির্যাতন ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই সূরার প্রতিটি আয়াত নবী ﷺ-কে সান্ত্বনা দেয়, শক্তি জোগায় এবং একই সঙ্গে সমগ্র উম্মাহকে আশার আলো দেখায়। সূরা আশ-শারহের আয়াত ও অর্থ (সংক্ষেপে) আল্লাহ তাআলা বলেন: “আমি কি তোমার হৃদয় প্রশস্ত করে দিইনি? আমি কি তোমার উপর থেকে তোমার বোঝা সরিয়ে দিইনি— যা তোমার পিঠকে ভারী করে তুলেছিল? আর আমি কি তোমার জন্য তোমার মর্যাদা উচ্চ করে দিইনি? নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। অতএব যখন তুমি অবসর পাও, তখন ইবাদতে মনোনিবেশ করো। আর তোমার রবের দিকেই তোমার আকাঙ্ক্ষা নিবদ্ধ করো।” (সূরা আশ-শারহ ৯৪:১–৮) সূরার ব্যাখ্যা ও গভীর শিক্ষা ১. হৃদয় প্রশস্ত করে দেওয়া – আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ “আমি কি তোমার হৃদয় প্রশস্ত করে দিইনি?” এর অর্থ—আল্লাহ রাসূল ...

বিদআত (উদ্ভাবন): দ্বীনের জন্য নীরব কিন্তু ভয়ংকর হুমকি

Image
বিদআত (উদ্ভাবন): দ্বীনের জন্য নীরব কিন্তু ভয়ংকর হুমকি ইসলামে বিদআত (উদ্ভাবন) বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। কারণ বিদআতের আলোচনা মূলত কুরআন ও সুন্নাহকে সংরক্ষণ করার জন্যই করা হয়। আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই—অনেক মুসলিম অজান্তেই এমন সব বিশ্বাস ও আমল গ্রহণ করছেন, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই কুরআন ও সহিহ সুন্নাহতে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় বিদআতকেই “সুন্নাহ” বলে প্রচার করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা বিদআত চালু করে, তাদের উদ্দেশ্য মন্দ নয়। কিন্তু সমস্যা হলো—ভালো নিয়ত থাকলেই কোনো কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না, যদি তা রাসূল ﷺ-এর পথের বিরুদ্ধে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “বলুন, আমি কি তোমাদেরকে কর্মের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের কথা জানাবো? তারা হলো তারা—যাদের দুনিয়ার জীবনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, অথচ তারা মনে করত যে তারা ভালো কাজ করছে।” (সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৩–১০৪) বিদআতের সংজ্ঞা ভাষাগত অর্থ আরবি ভাষায় বিদআত বলতে বোঝায়—কোনো কিছুকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা, যা আগে ছিল না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: “তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা (বাদী’)।” (সূরা আল-বাকারা ২:১১৭) অর্থাৎ, পূর্বে...

ভালো ঘর নয়—ঘরের মানুষের ঈমান, আখলাক ও ভালোবাসাই আসল সুখ | Sunnah Seekers

 ভালো ঘর নয়—ঘরের মানুষের ঈমান, আখলাক ও ভালোবাসাই আসল সুখ | Sunnah Seekers আমরা অনেক সময় ভাবি, বড় ঘর, বিলাসী জীবন, দামী আসবাব—এসব থাকলেই সুখ পাওয়া যায়। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়: সুখ কোনো স্থাপনায় নয়, মানুষের ঈমান ও আচরণে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন— “যে নেক আমল করে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করবো।” (সূরা আন-নাহল 16:97) অর্থাৎ সত্যিকারের শান্তি আসে নেক আমল, ভালো চরিত্র ও ঈমানের ফল হিসেবে। ঘরের মানুষের আচরণ কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? ১. ভালো আখলাক রহমত ডেকে আনে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।” (বুখারি) ভালো আখলাক ঘরকে জান্নাতের মতো প্রশান্ত করে। ২. দয়া ও কোমলতা ঘরে বরকত আনে নবী ﷺ বলেন— “আল্লাহ কোমল; তিনি কোমলতাকে ভালোবাসেন।” (মুসলিম) কঠোরতা ঘরকে ভেঙে দেয়, আর কোমলতা ঘরকে শক্ত করে। ৩. ধৈর্য ও ক্ষমা সুখী পরিবার গড়ে কুরআনে আছে— “তোমরা ক্ষমা করো ও উপেক্ষা করো।” (সূরা নূর 24:22) দাম্পত্য এবং পারিবারিক শান্তির মূল চাবি—ক্ষমা ও ধৈর্য। ঘরে সুখ চাইলে সুন্নাহ অনুযায়ী করণীয় ১. সুন্দরভাবে কথা বলা নবী ﷺ বলেছ...

সূরা আল-লাইল (আয়াত ১২–২১): ব্যাখ্যা, শিক্ষা ও বিশ্লেষণ

  সূরা আল-লাইল (আয়াত ১২–২১): ব্যাখ্যা, শিক্ষা ও বিশ্লেষণ আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই হিদায়াত আমাদেরই দায়িত্ব। আর নিশ্চয়ই পরকাল ও এই প্রথম জীবন—উভয়ই আমাদের অধীন। তাই আমি তোমাদেরকে প্রজ্বলিত আগুন সম্পর্কে সতর্ক করেছি। সেখানে দগ্ধ হবে না কেউ, কেবল সেই হতভাগ্য ব্যক্তি ছাড়া, যে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি তা থেকে দূরে রাখা হবে—যে তার সম্পদ ব্যয় করে নিজেকে পবিত্র করার জন্য, এবং কারো অনুগ্রহের প্রতিদান হিসেবে নয়; সে শুধু তার পরম প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দান করে। আর অবশ্যই সে সন্তুষ্ট হবে।” [সূরা আল-লাইল ৯২:১২–২১] আয়াতের সার্বিক ব্যাখ্যা ১. “নিশ্চয়ই হিদায়াত আমাদেরই দায়িত্ব” এখানে আল্লাহ ঘোষণা করছেন যে সত্য ও মিথ্যার পথ দেখানো তাঁর দায়িত্ব। তিনি ওহীর মাধ্যমে হালাল–হারাম, ঈমান–কুফর, সৎ–অসৎ সবকিছু স্পষ্ট করে দেন। মানুষ নিজে যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ সঠিক পথ বের করতে সক্ষম নয়; তাই আল্লাহই তাকে পথ দেখান। ২. “এবং পরকাল ও প্রথম জীবন আমাদেরই” এই দুনিয়ার মালিকও আল্লাহ, এবং পরকাল—যেখানে চূড়ান্ত বিচার হবে—তাও তাঁরই। এতে দ...

আধুনিক নাস্তিকতার যুক্তি ও তার খণ্ডন — অ্যান্টনি ফ্লুর দৃষ্টিতে একটি বিশ্লেষণ

Image
  আধুনিক নাস্তিকতার যুক্তি ও তার খণ্ডন — অ্যান্টনি ফ্লুর দৃষ্টিতে একটি বিশ্লেষণ আধুনিক যুগে নাস্তিকতা এমন একটি বৌদ্ধিক প্রবাহ, যা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং এটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিভিন্ন দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি সামনে আনে। তবে এই যুক্তিগুলোর বেশিরভাগই আংশিক, অসম্পূর্ণ বা ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—এমনটাই মনে করেন যুক্তিবাদী দার্শনিক অ্যান্টনি ফ্লু, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় নাস্তিকতার অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ছিলেন, পরে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। এই লেখায় তাঁর আলোচিত দুটি বিখ্যাত যুক্তি, নাস্তিকদের মূল দাবিগুলো এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তার জবাব তুলে ধরা হলো। প্রথম যুক্তি: ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন? নাস্তিকদের অন্যতম প্রচলিত প্রশ্ন হলো: "যদি প্রতিটি সৃষ্ট জিনিসের একজন স্রষ্টা থাকে, তাহলে ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছে?" এই প্রশ্নটি মূলত ভুল কারণ: এটি অসীম পশ্চাদপসরণের দিকে নিয়ে যায়। যদি ঈশ্বরকেও সৃষ্ট বলা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—তাঁকে কে সৃষ্টি করল? তারপর সেই স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? এইভাবে অসীম পর্যন্ত চলতে থাকবে, যা যুক্তির পরিপন্থী। সঠিক দৃষ্টিভঙ...

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নারীদের প্রতি যত্ন এবং উদারতা

   নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নারীদের প্রতি যত্ন এবং উদারতা পাঠ্য ও হাদিসগুলো থেকে দেখা যায় যে নবী করীম (সাঃ) নারীদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল এবং সহানুভূতিশীল ছিলেন। বিশেষভাবে: অনুপস্থিত নারীদের প্রতি খোঁজখবর নেওয়া: তিনি হজ্জ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত হতে পারলেন না, তাদের কারণে দুঃখিত ছিলেন এবং তাদের অবস্থা জানতে চাইতেন। উদাহরণ: উম্মে সিনান আল-আনসারীয়ার সাথে হজ্জ সম্পর্কিত ঘটনা। সহানুভূতি ও কষ্ট বোঝা: শিশুর কান্না বা অসুস্থতার কারণে নারীর কষ্ট বোঝার জন্য তিনি তার সালাত সংক্ষেপিত করেছিলেন। অপেক্ষা ও সহায়তা প্রদান: নারী যে দূর থেকে পানি আনছিল, তার জন্য তিনি সরাসরি সাহায্য এবং নিরাপদ ব্যবস্থা করেছিলেন, এমনকি তার সন্তানদেরও খাদ্য যোগান দিয়েছিলেন। সদয় সমালোচনা: কোনো ভুলের জন্য নারীদের নরমভাবে তিরস্কার করতেন। উদাহরণ: একজন মহিলা কবরের পাশে কাঁদছিল, তখন তিনি তাকে সহানুভূতিশীলভাবে ধৈর্য ধরতে বললেন। সারসংক্ষেপ: নবী (সাঃ) নারীদের প্রতি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল, স্নেহশীল এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। ২. একজন পুরুষের সাথে একজন মহিলার ক...

প্রকৃত ঈমানের চাবিকাঠি: “তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে”

 প্রকৃত ঈমানের চাবিকাঠি: “তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে” নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই মহান বাণীটি ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও সামাজিক দিকগুলির একটিকে প্রকাশ করে। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত এই হাদিস আমাদেরকে শেখায় যে, প্রকৃত বিশ্বাস শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা বা নিজস্ব নৈতিকতার সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সত্যিকারের মুসলিমের হৃদয় সর্বদা অন্যদের কল্যাণের প্রতি উদার ও সংবেদনশীল থাকে। হাদিসের মূল বার্তা “তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” এখানে ভাই বলতে কেবল পারিবারিক সম্পর্ক নয়, বরং সকল মুসলিম ভাই এবং মানবতা বোঝায়। যা নিজের জন্য ভালো লাগে , তা কেবল সম্পদ বা সুবিধা নয়, বরং সত্য, ন্যায়, নিরাপত্তা, এবং মানসিক শান্তি। অর্থাৎ, ঈমান সম্পূর্ণ হয় যখন আমরা আমাদের হৃদয়ে ঈমানের প্রতিফলন ঘটাই এবং সেই প্রতিফলন অন্যদের কল্যাণেও প্রয়োগ করি। সমাজে হাদিসের প্রয়োগ এই হাদিস যদি বাস্তব...

সমসাময়িক নাস্তিকতা: এক বিভ্রান্ত চিন্তার উত্থান

  সমসাময়িক নাস্তিকতা: এক বিভ্রান্ত চিন্তার উত্থান লিখেছেন: Sunnah Seeker আজকের বিশ্বে আমরা এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি—অনেক মানুষ নিজেদের “নাস্তিক” বলে পরিচয় দিচ্ছে। তারা দাবি করে, “ঈশ্বর বলে কিছু নেই”, “ধর্ম মানুষ তৈরি করেছে”, বা “বিজ্ঞানই সব ব্যাখ্যা দিতে পারে।” কিন্তু সত্যিই কি এমন? নাকি এটি কেবল বিভ্রান্তির আরেক রূপ? নাস্তিকতা মানে কী “নাস্তিকতা” বা আরবিতে ইলহাদ (إلحاد) শব্দের অর্থ—সত্য পথ থেকে সরে যাওয়া। ইসলামী দৃষ্টিতে, এটি এমন এক মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি, যেখানে মানুষ স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং নিজেকে স্বাধীন মনে করে। কিন্তু বাস্তবে, এই অস্বীকারই তার হৃদয়ের অস্থিরতা ও আত্মিক শূন্যতার প্রকাশ। ইতিহাসে নাস্তিকতা অতীতে মানুষ ভুল করেছিল—কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য জুড়ে দিয়েছিল (শিরক), কেউ আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেছিল। কিন্তু “স্রষ্টা নেই”—এই দাবি ইতিহাসে প্রায় অনুপস্থিত। মানব প্রকৃতি নিজেই এক স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকারে বাধ্য। আল্লাহ বলেন: “বলুন, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেন?... তারা বলবে, ‘আল্লাহ।’” (সূরা ইউনুস ১০:৩১) অতএব, সত্যিক...

মসজিদ ইসলামের সবচেয়ে সম্মানিত স্থান। মসজিদের প্রতি আদব বা শিষ্টাচার রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

 মসজিদের আদব মসজিদ ইসলামের সবচেয়ে সম্মানিত স্থান। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদত করে, কুরআন তেলাওয়াত করে, নামাজ পড়ে এবং ইসলামী শিক্ষা লাভ করে। তাই মসজিদের প্রতি আদব বা শিষ্টাচার রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। প্রথমত মসজিদ নির্মাণ ও পবিত্রতার আদব মসজিদ শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য। এখানে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরীক করা যাবে না। শিরক বা কবরপূজার মতো কোনো কাজের স্থান যেন মসজিদ না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর কয়েকদিন আগে বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের নবী ও সৎ লোকদের কবরকে ইবাদতের স্থান বানিয়েছিল। তোমরা কবরকে ইবাদতের স্থান বানিও না, আমি তোমাদের তা করতে নিষেধ করছি। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুকালীন অসুস্থতার সময় বলেন, আল্লাহ ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের ওপর অভিশাপ করুন, তারা তাদের নবীদের কবরকে ইবাদতের স্থান বানিয়েছিল। তিনি ভয় করতেন যে, তাঁর কবরকেও কেউ ইবাদতের স্থান বানাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর উঁচু করা, গম্বুজ বা ইটের কাঠামো নির্মাণ করা বা তা প্লাস্টার করার অনুমতি দেননি। ইবনুল কা...

মুমিনদের ঐক্য ও পারস্পরিক সহায়তা

   মুমিনদের ঐক্য ও পারস্পরিক সহায়তা আরবি হাদীসের সারমর্ম: আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মুমিনরা একটি কাঠামোর (ভবনের) মতো; যার প্রতিটি অংশ অন্য অংশকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।” তারপর তিনি তাঁর আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে দেখালেন। ( সহিহ আল-বুখারী ও মুসলিম — মুত্তাফাকুন আলাইহি ) বর্ণনাকারীর পরিচয়: আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (আবদুল্লাহ ইবন কাইস রা.) ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন হিজরতের আগে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন পরে হাবশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করেন খাইবার বিজয়ের পর মদীনায় ফিরে আসেন নবী ﷺ তাঁকে ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন উমর ও উসমান (রা.) তাঁকে যথাক্রমে বসরা ও কূফার গভর্নর বানান ৪৪ হিজরিতে মৃত্যু বরণ করেন বাক্যাংশের ব্যাখ্যা: “বিশ্বাসীরা একটি কাঠামোর মতো” অর্থাৎ মুমিনরা পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সহানুভূতির বন্ধনে এমনভাবে যুক্ত থাকবে যেমন একটি দৃঢ় ভবনের ইটগুলো একে অপরের উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। নবী ﷺ তাঁর আঙুলগুলো জড়িয়ে এই ধারণাটিকে বাস্তব চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন — যাতে মুমিনদের ঐক্য, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সং...

সাহায্য ও রিযিক দুর্বলদের কারণে

  সাহায্য ও রিযিক দুর্বলদের কারণে আরবি হাদীসের সারমর্ম: مُصْعَب بن سعد رضي الله عنه থেকে বর্ণিত — সা‘দ মনে করতেন যে, তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি শ্রেষ্ঠ। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমাদের কি সাহায্য করা হয় এবং রিযিক দেওয়া হয় না কি তোমাদের দুর্বলদের কারণে?” (সহীহ আল-বুখারী) হাদীসের বর্ণনাকারী: সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনি কুরাইশ বংশের, ইসলামে ষষ্ঠ ব্যক্তি যিনি ঈমান গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির (আশারায়ে মুবারাক্কাহ) একজন এবং ইসলামের প্রথম তীরন্দাজ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদের যুদ্ধে তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “হে সা‘দ, নিক্ষেপ করো! আমার বাবা-মা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক।” এ কথা তিনি আর কাউকে বলেননি। বাক্যাংশের ব্যাখ্যা: “সা‘দ ভেবেছিলেন যে তাঁর চেয়ে কম ভাগ্যবানদের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব আছে” অর্থাৎ, সাহস, উদারতা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। এটি অহংকার বা আত্মপ্রশংসার কারণে ছিল না, বরং তিনি ভেবেছিলেন তাঁর কর্ম ও শক্তির কারণে তিনি অন্যদের তুলনায় বেশি ফলপ্রসূ। কিন্তু নবী সাল্...

যে আত্মাকে শুদ্ধ করে, সে জান্নাতের যোগ্য হয় — আর যে আত্মাকে মন্দে নিমজ্জিত করে, সে জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত হয়।

  সূরা আশ-শামস — আত্মার পরিশুদ্ধি ও নৈতিক সাফল্যের শিক্ষা সূত্র: সূরা আশ-শামস (সূরা ৯১: আয়াত ১–১০) অবতীর্ণ স্থান: মক্কা আয়াতসমূহ আল্লাহ তাআলা বলেন: “শপথ সূর্যের ও তার আলোর, আর চাঁদের, যখন তা তার অনুসরণ করে, আর দিনের, যখন তা সূর্যকে উদ্ভাসিত করে, আর রাতের, যখন তা সূর্যকে ঢেকে ফেলে, আর আকাশের, যিনি তা নির্মাণ করেছেন, আর পৃথিবীর, যিনি তা বিস্তৃত করেছেন, আর আত্মার, যিনি তা সুঠামভাবে গঠন করেছেন, এবং তাকে তার পাপ ও ধার্মিকতার জ্ঞান দান করেছেন, সে সফল হয়েছে যে আত্মাকে পবিত্র করেছে, আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে আত্মাকে কলুষিত করেছে।” [আশ-শামস ৯১:১–১০] আয়াতের সারমর্ম ও ভাষ্য ১. সূর্য ও চন্দ্রের শপথ আল্লাহ সূর্যের আলো ও তেজের শপথ করেছেন, কারণ সূর্য আল্লাহর শক্তি ও প্রজ্ঞার এক মহা নিদর্শন। চাঁদের শপথ করা হয়েছে, কারণ তা সূর্যের আলো ধার নিয়ে রাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। দিন ও রাতের এই পরিবর্তনই আল্লাহর পরিকল্পনা ও ভারসাম্যের প্রতীক। ২. আকাশ ও পৃথিবীর শপথ আল্লাহ আকাশের শপথ করেছেন, যাকে তিনি সুবিন্যস্তভাবে নির্মাণ করেছেন। তিনি পৃথিবীর শপথ করেছেন, যাকে তিনি জীবজন্তুর বাসযোগ্য কর...

আত্মসংযম, দান, দয়া ও ঈমানের শিক্ষা

Image
 আত্মসংযম, দান, দয়া ও ঈমানের শিক্ষা আয়াতসমূহ আল্লাহ বলেন, কিন্তু সে কঠিন পথ অতিক্রম করেনি। আর তুমি কি জানো সেই কঠিন পথ কী? তা হলো একজন দাসকে মুক্ত করা, অথবা তীব্র ক্ষুধার দিনে একজন নিকটাত্মীয় এতিম কিংবা অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাদ্য দান করা। এরপর যারা ঈমান এনেছে, একে অপরকে ধৈর্য ও দয়ার উপদেশ দিয়েছে, তারাই ডানদিকের সঙ্গী। আর যারা আমার নিদর্শন অস্বীকার করেছে, তারাই বামদিকের সঙ্গী; তাদের উপর থাকবে আগুন ঘেরা। সূরা আল-বালাদ ৯০:১১–২০ আয়াতের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য আকাবা শব্দের অর্থ হলো দুর্গম পাহাড়ি পথ বা এমন একটি রাস্তা যা পার হওয়া কঠিন। আল্লাহ এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন মানুষের নফস, খেয়াল-খুশি ও শয়তানের প্রলোভনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বোঝাতে। অর্থাৎ, কঠিন পথ হলো সেই নৈতিক ও আত্মিক সংগ্রাম যেখানে একজন মানুষ নিজের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতার বিপরীতে সৎকর্মের দিকে এগিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, সে কেন কঠিন পথটি অতিক্রম করল না? অর্থাৎ, কেন সে নিজের নফসকে পরাস্ত করে সৎকর্মে প্রবেশ করল না? কঠিন পথ আসলে কী আল্লাহ নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন যে কঠিন পথ মানে কষ্ট ভোগ নয়, বরং মানবিক দায়িত্বে এগিয়ে আসা। একজন দাসকে ...

তাওয়াসসুল (তাওয়াসসুলের সঠিক ধারণা ও বিভাজন)

Image
  তাওয়াসসুল (তাওয়াসসুলের সঠিক ধারণা ও বিভাজন) — ইসলামী আক্বীদাহর আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ লিখেছেন: Sunnah Seekers Team  ভূমিকা ইসলামে ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা । মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে, যেমন দোয়া, সৎকর্ম, তাওহীদ, তাওবা ইত্যাদি। এই নৈকট্য অর্জনের পদ্ধতিকেই বলা হয় তাওয়াসসুল (توسل) — অর্থাৎ, “উপায় বা মাধ্যম গ্রহণ করা যার দ্বারা আল্লাহর কাছে পৌঁছানো যায়।” কিন্তু ইসলামী শরীয়ত পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, কোন কোন উপায়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ বৈধ এবং কোনগুলো অবৈধ বা বিদআত। তাওয়াসসুলের প্রধান দুই বিভাগ তাওয়াসসুল দুই শ্রেণীতে বিভক্ত: বিধিসিদ্ধ (নির্ধারিত) তাওয়াসসুল — যা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। বিধিবহির্ভূত (নির্ধারিত নয়) তাওয়াসসুল — যা শরীয়তের কোনো ভিত্তি নেই এবং শিরকের দিকে পরিচালিত করতে পারে। প্রথম শ্রেণী: নির্ধারিত তাওয়াসসুল এগুলো সেই সকল পদ্ধতি যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ দ্বারা অনুমোদিত এবং সাহাবায়ে কেরাম তা অনুসরণ করেছেন। নিচে ছয়টি প্রমাণিত পদ্ধতি বি...