পরম করুণাময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু (আওলিয়া) এবং শয়তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে পার্থক্য

 

পরম করুণাময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু (আওলিয়া) এবং শয়তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে পার্থক্য

ইসলামী আকীদার আলোকে একটি স্পষ্ট ও প্রামাণ্য আলোচনা

মানুষের মধ্যে দুই ধরনের ঘনিষ্ঠতা বিদ্যমান—একটি আল্লাহর সাথে, আরেকটি শয়তানের সাথে। কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে এই দুই শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছে, যাতে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা যায় এবং মানুষ সঠিক পথ বেছে নিতে পারে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বিভিন্ন স্থানে তাঁর বান্দাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কিভাবে মুমিনদের সাহায্য করেন এবং জালিমদের ধ্বংস করেন। যেমন বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়া এবং সমুদ্র বিভক্ত করে তাদের রক্ষা করা। এগুলো আল্লাহর সাহায্যের বাস্তব উদাহরণ, যা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য হয়ে থাকে।

একইসাথে আল্লাহ নির্দেশ দেন, যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে। কারণ শয়তানের কোনো কর্তৃত্ব নেই প্রকৃত মুমিনদের উপর—যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে। বরং তার প্রভাব পড়ে তাদের উপর, যারা তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে এবং আল্লাহর সাথে শরীক করে।

আওলিয়া ও শয়তানের বন্ধুদের পরিচয়

যদি আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা হন তারা, যারা ঈমান আনে, তাঁর আনুগত্য করে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, তাহলে শয়তানের বন্ধু হলো তারা, যারা আল্লাহর অবাধ্য হয়, কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতা করে এবং শয়তানের প্রলোভনে পড়ে।

প্রখ্যাত ইসলামি আলেম Ibn Taymiyyah রহ. বলেন, মানুষের মধ্যে এই দুই শ্রেণি সবসময়ই থাকবে, তাই তাদের মধ্যে পার্থক্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই নিজেদেরকে আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে তারা শয়তানের অনুসারী। তাই বাহ্যিক কিছু দেখে নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই করা অপরিহার্য।

পার্থক্যের প্রধান লক্ষণসমূহ

বিশ্বাস বা ঈমান

আল্লাহর ওয়ালী হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ঈমান। এর মধ্যে ঈমানের ছয়টি মূল স্তম্ভের উপর বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত—আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূলগণ, আখিরাত এবং তাকদীর।

যে ব্যক্তি এই মৌলিক বিশ্বাসগুলোতে দৃঢ় নয়, সে নিজেকে যতই ওয়ালী দাবি করুক না কেন, সে কখনো আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারে না।

ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক মুশরিক নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের অভিভাবক মনে করত। কিন্তু আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রকৃত অভিভাবক হলো সৎকর্মশীল ও তাকওয়াবান ব্যক্তিরা।

একজন ব্যক্তি যত বড় আলেম, সাধক বা ইবাদতকারীই হোক না কেন, যদি সে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনা দ্বীনের উপর পূর্ণ বিশ্বাস না রাখে, তবে সে মুমিন নয় এবং আল্লাহর ওয়ালীও নয়।

ধার্মিকতা বা তাকওয়া

তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য তাঁর আদেশ পালন ও নিষেধ বর্জন করা।

আল্লাহ বলেন, তাঁর বন্ধুদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না—যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।

তাকওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামী শিষ্টাচার মেনে চলা এবং এমন সবকিছু পরিহার করা যা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

একজন মুমিন পাপমুক্ত নয়, কিন্তু সে পাপ করলে তওবা করে এবং পাপে স্থায়ী থাকে না। পক্ষান্তরে যারা গুনাহে লিপ্ত থাকে, বিদআত অনুসরণ করে এবং দ্বীনের বিরুদ্ধে চলে, তারা কখনো আল্লাহর বন্ধু হতে পারে না। বরং তারা শয়তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত।

অনুসরণ করা বা ইত্তিবা

আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।

আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন।

অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে কিন্তু নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করে না, তার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সে সত্য থেকে বিচ্যুত।

যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাহ পরিবর্তন করে বা বিদআত সৃষ্টি করে, তারা আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারে না।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ইমামগণ বলেছেন, যদি তোমরা কাউকে পানির উপর হাঁটতে বা আকাশে উড়তে দেখো, তবুও তাকে যাচাই না করে বিশ্বাস করো না। বরং দেখতে হবে সে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে কি না।

এর দ্বারা বোঝা যায়, অলৌকিক কিছু দেখেই কাউকে আল্লাহর বন্ধু মনে করা বড় ভুল।

আল্লাহর বন্ধুদের ভালোবাসা

আল্লাহর নবীগণ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তাদের পরে সর্বোত্তম হলো নবীর সাহাবীগণ।

যে ব্যক্তি সাহাবীদের ঘৃণা করে বা নেককার মুমিনদের বিরোধিতা করে, সে কখনো আল্লাহর বন্ধু হতে পারে না। বরং সে শয়তানের পথ অনুসরণ করছে।

আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা রাখা ঈমানের অংশ, আর তাদের শত্রুতা করা আল্লাহর সাথে শত্রুতা করার সমান।

কারামাত সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি

আহলে সুন্নাহ বিশ্বাস করে যে, কারামাত সত্য। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের মাধ্যমে অসাধারণ কিছু ঘটনা ঘটাতে পারেন।

কুরআনে মারইয়াম আলাইহাস সালাম এর ঘটনা, সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর কাহিনীসহ অনেক উদাহরণ রয়েছে। এছাড়া সাহাবী ও তাবেঈনদের জীবনেও বহু কারামাত বর্ণিত হয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কারামাত কোনো ব্যক্তির ওয়ালী হওয়ার প্রমাণ নয়। বরং তার ঈমান, তাকওয়া এবং সুন্নাহ অনুসরণই আসল মাপকাঠি।

উপসংহার

আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং শয়তানের বন্ধুদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো ঈমান, তাকওয়া এবং সুন্নাহর অনুসরণ।

যে ব্যক্তি এই তিনটি গুণ ধারণ করে, সে আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আর যে ব্যক্তি এগুলো থেকে বিচ্যুত হয়, সে শয়তানের পথের অনুসারী।

তাই আমাদের উচিত বাহ্যিক কিছু দেখে প্রভাবিত না হয়ে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে মানুষ ও নিজেদেরকে যাচাই করা এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

Comments

Popular posts from this blog

ঈমানের স্তম্ভ: ফেরেশতা ও কিতাবসমূহে বিশ্বাস | Sunnah Seekers

সূরা আল-লাইল (আয়াত ১২–২১): ব্যাখ্যা, শিক্ষা ও বিশ্লেষণ