শপথ ও প্রতিজ্ঞার বিধান, প্রকারভেদ ও কাফফারা ইসলামী দৃষ্টিতে

 শপথ ও প্রতিজ্ঞার বিধান, প্রকারভেদ ও কাফফারা ইসলামী দৃষ্টিতে

শপথের সংজ্ঞা

আরবি শব্দ ‘আইমান’ হলো ‘ইয়ামিন’-এর বহুবচন। এর অর্থ শপথ, শক্তি এবং আশীর্বাদ। শপথকে ‘ইয়ামিন’ বলা হয়, কারণ মানুষ শপথ করার সময় একে অপরের ডান হাত ধরত।

ইসলামী পরিভাষায়, আল্লাহর নাম বা তাঁর কোনো গুণ উল্লেখ করে কোনো বিষয়কে নিশ্চিতভাবে সমর্থন করাকে শপথ বলা হয়।

কুরআন, সুন্নাহ এবং আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী শপথ করা জায়েজ।

আল্লাহ বলেন যে অর্থহীন শপথের জন্য দোষারোপ করা হবে না, তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শপথ ভঙ্গের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কেউ শপথ করার পর তার চেয়ে উত্তম কিছু দেখতে পায়, তাহলে সে উত্তম কাজটি করবে এবং শপথ ভঙ্গের কাফফারা আদায় করবে।

ইবনে কুদামাহ বলেছেন, উম্মাহ একমত যে শপথ করা জায়েজ এবং এর বিধানসমূহ প্রমাণিত।


শপথ সংক্রান্ত বিধান

মূল নীতি হলো শপথ করা জায়েজ।

যদি শপথের উদ্দেশ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা বা অন্যায় প্রতিরোধ করা হয়, তাহলে তা বাধ্যতামূলক।

যদি কোনো ভালো কাজ এর উপর নির্ভর করে, তাহলে তা মুস্তাহাব।

অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্রয়-বিক্রয়ে শপথ করা মাকরুহ।

মিথ্যা শপথ বা হারাম কাজ করার শপথ হারাম।


শপথের বিভাগ

বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে শপথ তিন প্রকার।

প্রথম প্রকার হলো অর্থহীন শপথ।
এটি এমন শপথ যা অনিচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারিত হয়, যেমন “আল্লাহর কসম না” বা “আল্লাহর কসম হ্যাঁ”।
এই ধরনের শপথের জন্য কোনো কাফফারা নেই এবং কোনো গুনাহ হয় না।

দ্বিতীয় প্রকার হলো এমন শপথ যা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়, যাকে আল-ইয়ামিন আল-গামুস বলা হয়।
এটি অতীতের কোনো বিষয় সম্পর্কে জেনে-শুনে মিথ্যা শপথ করা।
এটি বড় গুনাহ এবং এর জন্য তাওবা করা ও মানুষের হক আদায় করা জরুরি।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বড় গুনাহের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, হত্যা এবং মিথ্যা শপথ।

তৃতীয় প্রকার হলো বাধ্যতামূলক শপথ।
এটি ভবিষ্যতের কোনো কাজ করার বা না করার শপথ।
এটি পালন করতে হবে, অথবা ভঙ্গ করলে কাফফারা দিতে হবে।


শপথ ভঙ্গের কাফফারা

শপথ ভঙ্গ করলে কাফফারা আদায় করতে হয়। কাফফারা হলো ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু কাজ করা।

কাফফারার পদ্ধতি হলো

দশজন দরিদ্রকে খাবার খাওয়ানো
অথবা তাদের পোশাক প্রদান করা
অথবা একজন দাস মুক্ত করা

যদি কেউ এগুলোর কোনোটি করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে তিন দিন রোজা রাখতে হবে।

যদি কেউ প্রথম তিনটির যেকোনোটি করতে সক্ষম হয়, তাহলে রোজা রাখার বিকল্প গ্রহণ করা যাবে না।

পরপর তিন দিন রোজা রাখা উত্তম।


শপথ ভঙ্গের সময়

শপথ ভঙ্গ করলে কাফফারা দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়।

শপথ ভঙ্গের আগে কাফফারা দেওয়া জায়েজ, আবার পরে দেওয়াও জায়েজ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কেউ শপথ করার পর দেখে অন্য কিছু উত্তম, তাহলে সে উত্তম কাজটি করবে এবং কাফফারা আদায় করবে।


শপথ ভঙ্গের বিধান

শপথ ভঙ্গের বিধান শপথের বিষয় অনুযায়ী ভিন্ন হয়।

যদি কেউ মাকরুহ কাজ করার বা ভালো কাজ না করার শপথ করে, তাহলে শপথ ভঙ্গ করা উত্তম।

যদি কেউ ফরজ কাজ না করার শপথ করে, তাহলে শপথ ভঙ্গ করা বাধ্যতামূলক এবং কাফফারা দিতে হবে।

যদি কেউ কোনো হালাল কাজ করার বা না করার শপথ করে, তাহলে তা ভঙ্গ করা জায়েজ, তবে কাফফারা দিতে হবে।


আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ

আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করা জায়েজ নয়। যেমন

নবীর কসম
পিতার কসম
কারো জীবনের কসম
কবরের কসম
সম্মানের কসম

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করে, সে শিরক করেছে।

তিনি আরও বলেছেন, যার শপথ করতে হয় সে যেন আল্লাহর নামেই শপথ করে, নতুবা চুপ থাকে।

ইবনে মাসউদ বলেছেন, আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করার চেয়ে অন্য কিছুর নামে সত্য শপথ করা বেশি গুরুতর।


শপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ইসলামে নিয়ন্ত্রিতভাবে অনুমোদিত। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে শপথ করা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং শপথ করলে তা রক্ষা করা উচিত। আর যদি ভঙ্গ করা হয়, তাহলে শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা আদায় করতে হবে।

Comments

Popular posts from this blog

ঈমানের স্তম্ভ: ফেরেশতা ও কিতাবসমূহে বিশ্বাস | Sunnah Seekers

সূরা আল-লাইল (আয়াত ১২–২১): ব্যাখ্যা, শিক্ষা ও বিশ্লেষণ