সর্বোচ্চের প্রশংসাগীতি: সূরা আল-আ'লার স্নিগ্ধ ছায়ায়
সর্বোচ্চের প্রশংসাগীতি: সূরা আল-আ'লার স্নিগ্ধ ছায়ায়
কুরআনের প্রতিটি সূরা এক একটি জ্ঞানের মহাসাগর, যা আমাদের আত্মাকে আলোকিত করে এবং আমাদের জীবনকে পথ দেখায়। এমনই একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী সূরা হলো সূরা আল-আ'লা (সর্বোচ্চ)। মক্কায় অবতীর্ণ এই সূরাটি শুরু হয়েছে একটি শক্তিশালী নির্দেশ দিয়ে, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক: আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা।
আসুন, এই সূরার প্রথম আটটি আয়াতের গভীর অর্থ এবং আমাদের জন্য এতে থাকা শিক্ষাগুলো নিয়ে চিন্তা করি।
১. তাসবীহ: শুধু শব্দের চেয়েও বেশি কিছু
সূরাটি শুরু হয়েছে এই আয়াত দিয়ে:
{سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى} "তোমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ঘোষণা করো।"
তাসবীহ (পবিত্রতা ঘোষণা) মানে কেবল মুখে "সুবহানাল্লাহ" বলা নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহকে এমন সমস্ত ত্রুটি বা অপূর্ণতা থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করা যা তাঁর মহত্ত্বের সঙ্গে বেমানান। এটি আল্লাহর স্মরণ (যিকির), তাঁর ইবাদত এবং তাঁর বিশালতার সামনে নিজের বিনয় প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে এই আয়াতকে জীবনে প্রয়োগ করতে হয়। উকবা ইবনে আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন রাসূল (ﷺ) বলেন: "এটি তোমরা সিজদায় পড়ো।" (আবু দাউদ)। এজন্যই আমরা সিজদায় বলি, "সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা" (আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালক পবিত্র)।
"আল-আ'লা" (সর্বোচ্চ) নামটি আল্লাহর দুই ধরনের মহিমাকে নির্দেশ করে:
গুণাবলীর মহিমা: সমস্ত পরিপূর্ণ ও সুন্দর গুণাবলী একমাত্র আল্লাহরই।
সত্তার মহিমা: তিনি তাঁর সকল সৃষ্টি থেকে ঊর্ধ্বে, তাঁর আরশের উপর সমুন্নত।
২. স্রষ্টা, পরিকল্পনাকারী এবং পথপ্রদর্শক
আল্লাহ কেবল আমাদের সৃষ্টি করেননি, বরং সবকিছুকে এক নিখুঁত রূপ ও বিন্যাস দিয়েছেন।
{الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ * وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ} "যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন, এবং যিনি সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুসারে তৈরি করেছেন, তারপর তাদেরকে পথ দেখিয়েছেন।"
প্রতিটি সৃষ্টি, তা ক্ষুদ্র পোকামাকড় হোক বা বিশাল নক্ষত্র, একটি নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি। আল্লাহ শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি, বরং প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী পথও দেখিয়েছেন। তিনি তৃণভূমি থেকে সবুজ ঘাস উৎপন্ন করেন, যা প্রাণীরা খায়। আবার সময়ের সাথে সাথে সেই সবুজ চারণভূমি শুকিয়ে কালো খড়কুটোয় পরিণত হয়। এই পরিবর্তন তাঁর অসীম ক্ষমতারই নিদর্শন।
৩. ঐশী প্রতিশ্রুতি: কুরআন সংরক্ষণের গ্যারান্টি
এরপর আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-কে এক বিশেষ সুসংবাদ দেন, যা পুরো উম্মতের জন্য একটি বড় आश्वासन।
{سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ * إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ} "আমরা তোমাকে পাঠ করাবো, আর তুমি ভুলে যাবে না, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া।"
এটি ছিল কুরআন সংরক্ষণের একটি ঐশী প্রতিশ্রুতি। যখন জিবরীল (আঃ) ওহী নিয়ে আসতেন, তখন রাসূল (ﷺ) ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত ঠোঁট নাড়াতেন। আল্লাহ তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে, কুরআন তাঁর অন্তরে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর।
কিন্তু "আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া" এর অর্থ কী? তাফসীরকারকগণ এর দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
কিছু আয়াতের পাঠ রহিত হওয়া: এমন কিছু আয়াত ছিল যা পরে আল্লাহর নির্দেশে রহিত (abrogate) করা হয়েছিল।
সাময়িক মানবিক বিস্মৃতি: একজন মানুষ হিসেবে রাসূল (ﷺ) কখনো কখনো কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতেন, যেমনটি নামাযের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ঘটতো। এটি তাঁর মানবিক প্রকৃতিরই অংশ ছিল।
৪. সহজ পথের দিশা
সূরাটির এই অংশের শেষে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আরও একটি সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেন:
{وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَىٰ} "এবং আমরা তোমাকে সহজ পথের দিকে পরিচালিত করব।"
এই আয়াতটি আমাদের জন্য এক বিরাট সুসংবাদ। আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য দ্বীনের পথ, সৎকর্ম এবং ওহী মুখস্থ করার প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছিলেন। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ)-কে যখনই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হতো, তিনি সবসময় সহজটিই বেছে নিতেন, যদি না তা কোনো পাপের কাজ হতো।
এই "সহজ পথ" (Al-Yusra) আমাদের জন্যও একটি বার্তা। ইসলাম কঠোরতার ধর্ম নয়, বরং এটি একটি সহজ ও স্বাভাবিক জীবন বিধান।
আমাদের জন্য শিক্ষা
আল্লাহর মহিমা ঘোষণা: আমাদের প্রতিটি সিজদা ও প্রার্থনায় আল্লাহর মহত্ত্বকে স্মরণ করা উচিত।
সৃষ্টি নিয়ে ভাবনা: আল্লাহর সৃষ্টি ও তার নিখুঁত পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা করলে আমাদের ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
কুরআনের উপর আস্থা: আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখা উচিত যে, কুরআন আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত এবং এতে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সহজ পথ অবলম্বন: দ্বীনের বিষয়ে এবং মানুষের সাথে আচরণে আমাদের সর্বদা সহজ ও কোমল পথ অবলম্বন করা উচিত।
আসুন, আমরা সূরা আল-আ'লার এই গভীর শিক্ষাগুলো আমাদের জীবনে ধারণ করি এবং আল্লাহর মহিমা বর্ণনার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করার চেষ্টা করি। আমীন।

Comments
Post a Comment